দ্বীন ও কুরআনে কারীম শিখিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণকারী

582 views
0

মাওলানা সা’দ সাহেব দামাত বারকাতুহুম এক বয়ানে প্রসঙ্গক্রমে (নিজে থেকে কিছু না বলে) হায়াতুস সাহাবার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “হে কুরআন শিখানেওয়ালা, হে দ্বীন শিখানেওয়ালা তোমরা এর (কুরআন শিখানোর) বিনিময়ে মূল গ্রহন করো না, অন্যথায় নীচ (কামিনা) ব্যাক্তিরা তোমাদের আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে”।

সুবহানআল্লাহ, মাওলানা সা’দ সাহেব দামাত বারকাতুহুম শব্দ ও বাক্য চয়ন এবং উলামায়ে কেরামের হক ও মর্যাদার ব্যাপারে কত সচেতন! খারাপ মহিলাদের বুঝাতে সমাজে প্রচলিত অশ্লীল কোন শব্দ মুখেও আনা থেকেও তিনি পরহেয করেছেন; যা তাঁর শরাফত, বুজুর্গি ও তাকওয়ার নিদর্শন। তাছাড়া তাঁর ব্যবহৃত বাক্যরীতিও সুস্পষ্ট ভাবে স্ত্রীবাচক নির্দেশ করে না।

আরো লক্ষ্যণীয়, তিনি পরপর তিনটি কথা বলেছেন। প্রথমত বয়ানে প্রসঙ্গ এসে যাওয়ায় তিনি নিজে থেকে কিছু না বলে উমর রাযিয়াল্লহু আনহুর ঐ বাণী উল্লেখ করেছেন। এই কথায় উপস্থিত জনতা যাতে আলেমদের ব্যাপারে ভুল ধারণা না করে তাই ঠিক পরপরই উলামায়ে কেরামের পক্ষে ওয়াজাহাত করেন যে, আমাদের আলেম সমাজ যে বেতন নিচ্ছেন তা ইলমের বিনিময় না, বরং ওয়াক্তের বদল। এর ঠিক পরের বাক্যেই আলেমদের মর্যাদা ও শান আরও উন্নত করে তিনি কসম করে বলেছেন, ইলমের বিনিময় জান্নাত ছাড়া কিছুই হতে পারে না। অর্থাৎ আলেমরা জান্নাতি।

মূল উর্দু বয়ানের লিংকঃ

২৩ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত
দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম মাওকিফ থেকে সংগৃহীত,
[লিঙ্কঃ http://www.darulifta-deoband.com/home/ur/Dawah–Tableeg/147286]
যার অনুবাদ – “০৪. পারিশ্রমিক নিয়ে দিন শেখানো দ্বীন বিক্রির নামান্তর। কোরআনে কারীম শিখিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণকারীর আগে যেনাকারীরা (স্ত্রীবাচক না পুরুষবাচক তা স্পষ্ট করা হয়নি) জান্নাতে যাবে।” সূত্রঃ দৈনিক ইনকিলাব।

লক্ষ্যণীয়
১। উক্ত বক্তব্য (আলমী শূরাপন্থী) মাওলানা যোবায়ের সাহেব হায়াতুস সাহাবাতেও যেভাবে অনুবাদ করেছেন তা দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়ায় উল্লেখিত মাওলানা সা’দ সাহেবের কথার অনুরূপ। “মুজাহিদ (রঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলিয়াছেন, হে! এল্‌ম ও কুরআনের বাহকগণ, তোমরা এল্‌ম ও কুরআনের বিনিময়ে মূল্যগ্রহণ করো না। অন্যথায় যেনাকারীরা তোমাদের পূর্বে জান্নাতে চলিয়া যাইবে।” (৪র্থ খন্ড ৬০২ পৃষ্ঠা)

২। মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহমাতুল্লাহি আলাইহি “তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন”-এ এভাবে লিখেছেন, “ইমাম আযম আবু হানিফা (রহঃ) প্রমুখ ইমাম তা (কুরআন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা) নিষেধ করেছেন (জায়েজ নয়)। কেননা রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনকে জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম পরিণত করতে বারণ করেছেন। ”।(বাংলা, সৌদি প্রিন্ট,পৃষ্ঠা- ৩৫) মুসনাদের আহমাদে বর্ণিত আছে, কুরআন পাঠ কর; কিন্তু এ-কে উপার্জনের উপায় বানিও না।

কোন কোন রেওয়ায়েতে কুরআন দ্বারা উপার্জিত বস্তুকে জাহান্নামের অংশ বলা হয়েছে। এসবের ভিত্তিতে উম্মতের ফকিহগণ একমত যে, ইবাদত-বন্দেগীর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েজ নয়। (মাসায়িলে মা’আরিফুল কুরআন, পৃষ্ঠা-৫০)।
দ্বীনী ইলম শিক্ষাদান বা দ্বীন-প্রচার কার্যে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা দুরস্ত নয়। তাই পূর্ববর্তী ইমামগণ একে হারাম বলেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালের ফেক্বাহবিদগণ অপারগ অবস্থায় এ-কে বৈধ সাব্যস্ত করেছেন। (মা’আরিফুল কুরআন ৬ষ্ঠ খন্ড; সূরা শু’আরা, আয়াতঃ ১০৯)

দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া “it is better to teach it (Holy Quran) without fee…” বেতন ছাড়া ইহা (পবিত্র কুরআন) শিক্ষা দেওয়া উত্তম…”। ।http://www.darulifta-deoband.com/home/…/The-Holy-Quran/50371
“The later Fuqha have allowed taking fee on teaching the Holy Quran for Shariah needs,…”পরবর্তী ফক্বিহ্‌গণ পবিত্র কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন নেওয়া শরঈ প্রয়োজনে জায়েজ করেছেন।”
http://www.darulifta-deoband.com/ho…/…/The-Holy-Quran/167874

এপ্রসঙ্গে মাওলানা সা’দ সাহেব রুজু

আসলে বান্দা এটা মনে করে যে, ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মাসলাক হলো, এবাদতের ক্ষেত্রে পারিশ্রমিক নেয়া জায়েজ নেই। কিন্তু পরবর্তী ফকীহগণ যে অনুমতি দিয়েছেন, তা সময় আটকে যাওয়ার বিবেচনা থেকে দিয়েছেন। এ জন্য তাকে তা‘লীমের উপর পারিশ্রমিক বলা যায় না। তবে বান্দা থেকে এ কথাকে বুঝানোর মধ্যে ত্রুটি হয়েছে এবং কথাকে এমনভাবে বলা হয়েছে। যা দ্বারা ইল্‌মে দ্বীন-এর শিক্ষকদের সম্পর্কে এই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পয়দা হয়েছে যে, তাদের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা নাজায়েজ। এই প্রতিক্রিয়া থেকেও বান্দা পরিষ্কার শব্দে রুজু করছি। [ মাওলানা সা’দ সাহেবের ৩য় রুজুনামা, তারিখ ৯ জানুয়ারী, ২০১৭, যা দারুল উলূমের দেওবন্দের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত।
লিঙ্কঃhttp://www.darulifta-deoband.com/home/ur/Dawah–Tableeg/148977]

দেওবন্দের ফতোয়ার নামে উক্ত বক্তব্যের বিভিন্ন রুপান্তর ও বিকৃতি

১। মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী ২৭ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে লেখেন, “১২. পারিশ্রমিক নিয়ে দ্বীন শেখানো দ্বীন বিক্রির নামান্তর৷ ব্যভিচারকারী কুরআনে কারীম শিখিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণকারীর আগে জান্নাতে যাবে।” দুঃখজনক! কথাটি মাওলানা সা’দ সাহেবের বয়ানে বা দেওবন্দের মাওকিফে মোটেই এভাবে আসেনি। এভাবে দারুল উলূম দেওবন্দের নামে ভুল অনুবাদ ও ভুল কথা ছড়ানো হচ্ছে। কোন বিরাম চিহ্ন নেই, শব্দের বিন্যাসের কারণে অন্যরকম অর্থ করা যায়।
লিঙ্কঃhttps://adarshanews24.com/article/4789/

২। “২৪. বিনিময় নিয়ে কুরআন কারিম পড়া নোংরা নারীর বিনিময়ের মতো। নোংরা নারী তার আগে জান্নাতে যাবে।” [দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৬] [ কুরআন কারিম শিখানো আর কুরআন কারিম পড়া কি এক জিনিস? তাছাড়া মূল বয়ানে বা দেওবন্দের মাওকিফে ‘নোংরা নারী’ কথাটি আসেনি। বরং উভয় স্থানেই ব্যবহৃত শব্দ ও বাক্যরীতি স্ত্রীবাচক হিসাবে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ] লিঙ্কঃ
(ক) (Research centre of deobandiyat), তাদের ব্লগস্পট সাইট হতে।
(খ) http://www.amaderislam.com
(১৮ ডিসেম্বর ২০১৮)
(গ) http://at.jamiahislamiahpatiya.com/?p=920
(আত তাওহীদ, পটিয়া মাদ্রাসার (চট্টগ্রাম) পত্রিকা)
৩। ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় আব্দুল্লাহ ফারুকের বরাত দিয়ে লেখা হয়, “কোরআন পড়িয়ে অর্থ নেওয়া হারাম: তিনি বলেন, ‘বিনিময় নিয়ে কোরআনে কারিম পড়া নোংরা নারীর বিনিময়ের মতো। নোংরা নারী তার আগে জান্নাতে যাবে। (সূত্রঃ দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া: ১৬)”
লিঙ্কঃhttps://www.kalerkantho.com/print-edition/islamic-life/2018/12/07/711691
[‘কুরআন পড়িয়ে অর্থ নেওয়া হারাম’ দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ার দোহাই দিয়ে মাওলানা সা’দ সাহেবের নামে মিথ্যা দোষারোপ (তোহমত) করেছেন। আল্লাহ্‌ সবাইকে মাফ করেন। ]
৪। মুফতী মনসূরুল হক হাফিযাহুল্লাহ বলেন,
اجرت لیکر قرآن پاک پڑھانا فاحشہ عورت کی اجرت کے مانند ہے، فاحشہ عورت ان سے پہلے جنت میں چلی جاوے گی۔
ক) কুরআন পড়িয়ে বিনিময় নেয়া পতিতার বিনিময়ের মতো। এমন লোকের আগে পতিতারা জান্নাতে যাবে! (সূত্র : দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া : ১৬) খ) অর্থাৎ যে সমস্ত আলেম দ্বীনী খেদমত করে বেতন নেয়, ঐ আলেমরা যিনাকারিনীর আগে জাহান্নামে যাবে।
[দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ার উর্দু বাক্যের সাথে মুফতী মনসূরুল হক হাফিযাহুল্লাহ এবং বেফাকুল উলামায়িল হিন্দের উর্দুর কোন মিল নেই। ‘জান্নাতের’ জায়গায় ‘জাহান্নাম’, ‘আলেম’ ‘দ্বীনী খেদমত’, ‘আলেমরা’ এই শব্দগুলো সম্পূর্ণ অতিরিক্ত। ]
লিঙ্কঃ(ক) https://adarshanari.com/articles/5466/
মাসিক আদর্শ নারী (২২ নভেম্বর ২০১৮)
(খ) তাবলীগ সিরিজ-৯, বেফাকুল উলামায়িল হিন্দ, ২৪ নং বয়ান, অনুবাদঃ আব্দুল্লাহ আল ফারুক)
(গ) ওয়াজাহাতী জোড় ২৮/০৭/২০১৮ https://www.youtube.com/watch?v=Y8GVQJltHOM

৫। মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী হাফিযাহুল্লাহ বলেন, মাওলানা সা’দ সাহেব বলেছেন, “যারা মাদ্রাসায় কুরআন হাদীস পড়িয়ে ভাতা গ্রহণ করে, যারা মসজিদে ইমামতি করে ভাতা গ্রহণ করে, যারা মসজিদে মুয়াজ্জিনি করে ভাতা গ্রহণ করে- এদের গৃহীত ভাতা বেশ্যা নারীর দেহ ব্যবসার উপার্জনের চেয়েও নিকৃষ্ট। …কিৎনা বড় বদমায়েশ হলে..” [মূল বক্তব্য খণ্ডিত ও বিকৃত করার পাশাপাশি এসময়ে মাওলানা ওলিপুরী হাফিযাহুল্লাহ বেশ অসম্মানজনক ভাষায় মাওলানা সা’দ সাহেবের নাম উচ্চারণ করেন এবং বেশ আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেন। একজন সতেচন ও প্রাজ্ঞ আলেম হিসেবে তাঁর থেকে এমনটা আশা করা যায় না।]
লিঙ্কঃ(ক) https://youtu.be/4KkwwGEcDHE
(খ)https://youtu.be/y5Wjwmkvr5M

৬। মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক হাফিযাহুল্লাহ, যিনি গত ২০১৮ ডিসেম্বরের ভোটের সময় জামায়াতে ইসলামীর কাছে মওদুদী সাহেবের ব্যাপারে সারা জীবনের কথা, কাজ ও লেখনীর জন্য রুজু করেছেন। আবার মাওলানা সা’দ সাহেবকে মওদুদীর সাথে তুলনা করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। সাদিয়ানী উপহাসমূলক নাম প্রচলন করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)।

তাঁর রেফারেন্স বিহীন, তাহকীক বিহীন, ভিত্তিহীন বানোয়াট বই পড়ে, আল্লাহ মালুম কত উলামা, সাধারণ সাথী বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং অন্যকে বিভ্রান্ত করেছেন! তাঁর ‘সা’দ সাহেবের আসল রূপ’ নামক চটি বইতে লিখেছেন, (পৃষ্ঠা-৫),। মাদ্রাসা মসজিদের বেতন বেশ্যার উপার্জনের চেয়ে খারাপ ৫. কুরআন শরীফ শিখিয়ে যারা বেতন গ্রহণ করেন, তাদের বেতন বেশ্যার উপার্জনের চেয়েও খারাপ। যে ইমাম এবং মুয়াজ্জিন বেতন গ্রহণ করেন, বেশ্যারা তাদের আগে জান্নাতে যাবেন। অনেক মিডিয়ায় এভাবেই বলা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর কাছে রুজুর লিঙ্কঃ https://www.youtube.com/watch?v=po8pomGX_hY

আল্লাহ ভাল জানেন, এভাবে ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য নিয়ে মাওলানা সা’দ সাহেব রুজু করা সত্ত্বেও তাঁর বয়ান খন্ডিত করে এবং দেওবন্দের মাওকিফের বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করে আগুনের মত ফিৎনা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যার ফলাফল সবাই অবগত।

(সৌজন্যেঃ বরেণ্য উলামায়ে কেরামের উদ্যোগ)

Changed status to publish