তাবলীগ জামাতের মধ্যে শূরা ও ইমারতের মধ্যে কোনটি গ্ৰহণযোগ্য?

647 views
0

মুফতী যার ওয়ালী খান সাহেব দামাত বারাকাতুহুম
********************
[মুফতী যার ওয়ালী খান সাহেব দামাত বারাকাতুহুমও পাকিস্তানের অন্যতম শীর্ষ আলেম। তিনি ‘শায়খুত তাফসীর’ হিসেবে সমগ্র পাকিস্তানে এক নামে পরিচিত। তিনি পাকিস্তানের অন্যতম শীর্ষ দ্বীনী প্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া আহসানুল উলূমের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক; যা করাচীর প্রাণকেন্দ্র গুলশানে ইকবালে অবস্থিত। সম্প্রতি পাকিস্তানের তাবলীগের কিছু পুরাতন সাথী তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি নিচের বক্তব্য দেন।]

——————————————————————————
তাবলীগ জামাতের বিভক্তি নিয়ে আপনাদের মনোবেদনার ব্যাপারে আমি অবগত হয়েছি। আল্লাহ তায়ালা তাবলীগ জামাতসহ অন্যান্য ইসলামী জামাত ও সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকার তাওফিক দান করুক।

প্রথম কথা হল তাবলীগ জামাতের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র নেজাম রয়েছে। এমতাবস্থায় তাবলীগের সাথে সম্পর্কহীন উলামায়ে কেরাম কিভাবে তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মতামত দিতে পারেন?

দ্বিতীয় কথা হল, এটা তো হিন্দুস্তানের বিষয়। বস্তি নিযামুদ্দিনে মাওলানা সা’দ সাহেব ও মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবের মধ্যে কিছু মত বিরোধ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে, যা অনুচিত ছিল। [বাংলাদেশে শূরাপন্থীরা তাদের বিদ্রোহে সফল হতে এই ইখতিলাফকে আলেম বনাম আওয়াম রূপ দিয়ে প্রোপ্যাগান্ডা চালাচ্ছে। কিন্তু উম্মতের বিচক্ষণ উলামায়ে কেরামদের ধোঁকা দেয়া যায়নি। তাঁরা ঠিকই বুঝেছেন যে, এটা মাওলানা সা’দ সাহেবের সাথে মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবের ব্যক্তিগত বিরোধ!]

তৃতীয়তঃ দারুল উলূম দেওবন্দ, তাঁরা সারা পৃথিবীতে উম্মতের অভিভাবকতুল্য এবং আহলে হকদের এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। তাঁরা এই বিষয়টি বিভিন্ন উপায়ে সুন্দর ভাবে সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু তাঁদের থেকে এমন কিছু ফতোয়া প্রকাশ করা হয়েছে যা প্রকাশ করা মোটেই উচিত হয়নি। এবং এই ফতোয়া প্রকাশ ও প্রচার করতে গিয়ে এভাবে পরহেয করা উচিত ছিল যেভাবে ইফতার নীতিনির্ধারকগণ যেমন আল্লামা ইবনুস সালাহ, আল্লামা ইবনুল হুমাম, ইবনে আমীর, মোহাম্মদ আমিন বোখারী প্রমুখ স্পষ্ট করেছেন যে, কারা ফতোয়া দিবে, কিভাবে দিবে। এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব কম দেয়ার কারণে এবং যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ফতোয়া দেয়া হয় তার প্রতি পরিপূর্ণ দৃষ্টি না দেয়ার কারণে লাভের পরিবর্তে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। আয়াত
إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَذِكْرَىٰ لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ
অর্থঃ এতে অবশ্যই উপদেশ রয়েছে তার জন্য যার আছে (বোধশক্তিসম্পন্ন) অন্তর কিংবা যে খুব মন দিয়ে কথা শুনে। (সুরা ক্বাফঃ ৩৭)

অপরদিকে আমাদের বুযুর্গদের অনুসরণ ও অনুকরণের বদৌলতে আল্লাহ তায়ালা আমাদের যে ইলম দিয়েছেন, মজলিসে শূরার অবশ্যই একজন আমীর হওয়া জরুরি। কুরআনের আয়াত–
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
“আপনি তাদের সাথে মাশোয়ারা করুন।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং আমীর ছিলেন এবং সাহাবা কেরামেরকে মাশোয়ারার আহল সাব্যস্ত করেছেন।

وامرهم شوري بينهم
“তাদের মধ্যে বিষয়গুলো মাশোয়ারা সাপেক্ষে হয়।” (সুরা শূরা ৩৮)
এই আয়াতেও শূরাদের মধ্যে একজন আমীর হবার ব্যাপারে তাফসীরের কিতাবসমূহে মুফাসসিরগণ একমত। যেমন ইবনে জারীর রহঃ, জামিউল বয়ান, ইবনে কাসীর, আল্লামা আলুসী রহঃ, রুহুল মাআনী উল্লেখযোগ্য। এ বিষয়ে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহমাতুল্লাহি আইলাহি বয়ানুল কুরআনে বিস্তারিত লিখেছেন। এছাড়া দারুল উলূম দেওবন্দের মুফতীয়ে আযম আল্লামা হাবিবুর রহমান খায়রাবাদী সাহেবের লিখিত ‛ইসলাম মে মাশোয়ারা কি আহমিয়াত’ (ইসলামে মাশোয়ারার গুরুত্ব) নামক পুস্তিকা থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে।

এমন স্পষ্ট বিষয়ে উলামায়ে দ্বীন কিভাবে না-হক বিষয়ের উপরে ফয়সালা করতে পারেন?

এরপরে, সমস্যা শূরা নিয়ে হোক বা ইমারতে শূরা নিয়ে হোক, তাবলীগের মূল যে মাকসাদ আল্লাহ তায়ালার দ্বীন মাখলুক পর্যন্ত পৌঁছানো তা তো অবশিষ্ট আছে।

এ থেকেই বুঝা যায় এখানে কিছুটা হলেও নফসানিয়াত বা খায়েশাত ঢুকে গেছে।

সুতরাং আপনাদের খেদমতে আরজ, আপনারা এই সংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলোর ব্যাপারে গভীর চিন্তা ভাবনা করে বুঝার চেষ্টা করবেন। আমরা কারো ব্যাপারে প্রোপ্যাগান্ডা চালাব না, তা দেওবন্দই হোক বা নিযামুদ্দিন। বরং দুআ করব যেন হক্বের এই উভয় মারকাজ সর্বদাই হক্বের উপর কায়েম থাকে। আমরা সকলের উপরে কৃতজ্ঞ। কেননা তাবলীগের কারণে উম্মতের প্রভূত ফায়দা হচ্ছে। আবার দেওবন্দও নির্ভর যোগ্য প্রতিষ্ঠান। আল্লাহ তায়ালা দেওবন্দের বিজ্ঞ মুফতীয়ানে কেরাম ও অন্যান্য উলামায়ে কেরামের মধ্যমপন্থা নসীব করুন।

শুনা কথার উপরে কারো ব্যাপারে ফতোয়া বা মতামত দেয়া দারুল উলূমের মত ইতিদালে মারকাজের জন্য কাম্য নয়। উপরন্তু তাঁদের শানেরও খেলাপ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে আহলে হকদের বৈশিষ্ট্য মোতাবেক সতর্কতা ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করার তাওফিক দান করুন। কুরআন পাকে আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতকে মধ্যমপন্থার উম্মত হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا
এভাবে আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি, যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ হতে পার এবং রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হবে। (বাকারা ১৪৩)

এরপর এক সাথীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমরা হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেবের [বর্তমানে ওফাতপ্রাপ্ত, রহমাতুল্লাহি আলাইহি] সাথে কথা বলেছি। তিনি আমীর হলে তাকাব্বুরী আসে – ইত্যাদি আরো কিছু এদিক সেদিকের কথা বলেছেন। আমরা বলেছি, এগুলো ভুল ধারণা। আমীর সাব্যস্ত করা, শূরার সাথে আমীর হওয়া কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণিত।
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
“আপনি তাদের সাথে মাশোয়ারা করুন৷ (কেননা আপনি শূরার আমীর)

وامرهم شوري بينهم
“তাদের কাজ মাশোয়ারা ভিত্তিক হয়৷”
আবার এই আয়াত দ্বারাও প্রমাণিত।

তাদের আমীর ছাড়া শূরার ধারণাটি যেন “বর ছাড়া কনে”। ধারণাটি স্পষ্টই গলদ।

এসব বর্ণনা আহকামে সুলতানিয়াসহ ক্বযা ও ইফতার সমস্ত কিতাবে উল্লেখ আছে যে, আমীরের জন্য শূরা প্রয়োজন (জরুরত) কিন্তু শূরার জন্য আমীর আবশ্যক (লাজেম)।

এ সব কিছু সত্ত্বেও উভয় পক্ষই আহলে হক্ব। শুধুমাত্র মেজাজের ভিন্নতার কারণে ইখতিলাফ বেড়ে গেছে। তাই যে যে পক্ষকে হক্বের বেশি কাছাকাছি মনে করে, তারই অনুরসরণ করবে।
ইনশাআল্লাহ আজর মিলবে নাজাতও মিলবে।

লিঙ্কঃ http://bit.ly/2m1dUqk [28]

Changed status to publish