ইসলামে নির্দিষ্ট বা নির্ধারিত শূরা ওয়াজিব করা হয়নি

500 views
0

মুফতী আবুল কালাম কাসেমী দামাত বারাকাতুহুম
********************
[ নায়েবে মুহতামিম, নাযিম (প্রধান), দারুল ইফতা, দারুল উলূম শায়খুল হাদীস যাকারিয়া, দেওবন্দ। তিনি শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহির খাদেম ও ঘনিষ্ঠ খলীফা এবং দারুল উলূম শায়খুল হাদীস যাকারিয়া, দেওবন্দ এর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মাদ শাফী রহমাতুল্লাহি আলাহির পুত্র। সম্প্রতি একটি বার্তা অনলাইনে এসেছে যেখানে তিনি বেশ কিছু ব্যাপারে আরজ করেছেন। আমরা লিঙ্ক সহ এখানে পেশ করছি। এই বার্তাটি তাঁর একাধিক কথা যোগ করে বানানো হয়েছে। আমরা এখানে আলাদা আলাদা শিরোনামে লিপিবদ্ধ করছি। ]

হামদ ও সানার পর
বুযুর্গ দোস্ত, বহুত বড় ব্যথার সাথে আমি কিছু কথা আপনাদের সামনে পেশ করতে চাই৷
فان كان صوابا فمن الله وان كان خطأ فمني ومن الشيطان
যদি কথাগুলো সঠিক হয়, তা আল্লাহর পক্ষ হতে৷ আর যদি ভুল হয় তা আমার নফস ও শয়তানের পক্ষ হতে৷
তাবলীগের মেহনতের মধ্যে আজকাল বেশ কিছু বিষয় বেশ খারাপ ভাবে প্রভাব ফেলছে। এ ব্যাপারে বুযুর্গগন তো চুপ আছেন। কিন্তু ছোট ছোট কিছু লোকের দ্বারা ‘শূরা’ ‘শূরা’ এক রব উঠেছে, আরও কত কিছু তাঁরা বলছে। এ জন্য কিছু কথা আরজ করছি। আল্লাহ তায়ালা কুরআন কারীমের এরশাদ করেছেনঃ
وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَىٰ بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামায কায়েম করে; পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে, [সূরা শূরাঃ ৩৮] (বঙ্গানুবাদঃ মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহঃ)
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ ۖ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
“আপনি তাদের সাথে পরামর্শ করুন, আর যখন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন তখন আল্লাহর উপরই পুরো ভরসা করবেন৷ নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তাওয়াক্কুলকারীদের ভালবাসেন৷ [সূরা আল ইমরানঃ ১৫৯]

কিন্তু আজকাল বিশেষ করে দাওয়াতের মেহনতের মধ্যে কিছু লোক দাবী জানাচ্ছেন মাশোয়ারার মধ্যে এই এই লোককে দাখিল করতে হবে। আমি বলছি এটা তো সত্য যে, আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাশোয়ারা করার হুকুম দিয়েছেন। কিন্তু সকল বিষয়ে আমীরের জন্য মাশোয়ারা করা কি ওয়াজিব? [বিষয়টি বুঝার জন্য সীরত থেকে একটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লহু আনহু দূর প্রবাসে জিহাদরত মুজাহিদদের প্রতি চারমাসের মধ্যে বাড়ি ফিরে আসার জন্য যে নির্দেশ জারি করেছিলেন এজন্য তিনি কোন মাশোয়ারা করেননি (মাকাতীবে সা’ঈদ, ৩৩নং চিঠি)।]

অর্থাৎ মতলব হল, ঐসব মাসায়েল যে ব্যাপারে উলামা, ফুকাহা, আঈম্মারা সবাই একমত, এক্ষেত্রে তো কোন মাশোয়ারারই প্রয়োজন নেই৷ তবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যেসব বিষয় সামনে আসে, সে বিষয়ে মাশোয়ারা করতে পারে; জায়েজ আছে৷
বিভিন্ন জন মাশোয়ারায় শরীক হয়ে বিভিন্ন উমূর দিবে, এর উপরে মাশোয়ারা করা হবে; এটা তো জায়েজ। কিন্তু এটাকে ওয়াজিব পর্যায়ে নেয়া, এজন্য এমন লড়াই করা এর কোন সুযোগ নেই। মাশোয়ারার ব্যপারে উলামায়ে কেরামের দুটি মত আছে। কেউ ওয়াজিব বলেছেন, কেউ মুস্তাহাব বলেছেন। ইমাম শাফেয়ী, ইমাম রবীয়া সহ আরও বিভিন্ন উলামায়ে কেরামের এমনই মত। কিছু নির্ধারিত ব্যক্তিদের সাথেই মাশোয়ারা করতে হবে [যাকে প্রচলিত ভাষায় শূরা বলা হয়] এটা কোনভাবেই প্রমাণিত নয়। হযরত আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাদে এমন কোন নির্ধারিত লোক কি ছিল যাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক ব্যাপারে ডাকতেন এবং মাশোয়ারা করতেন? মোটেই না।
এই সিলসিলার মধ্যে উলামায়ে কেরামের মতভিন্নতা এটা অন্য কথা। যেমন বলা হয় দ্বীনী কাজে মাশোয়ারা করা ওয়াজিব, দুনিয়াবী কাজে মাশোয়ারা করা মুস্তাহাব। কিন্তু দুনিয়াবী বা সিয়াসী (রাজনৈতিক) বিষয়েও কোন নির্দিষ্ট বা নির্ধারিত লোক/জামাত থেকেই মাশোয়ারা নিয়েছেন, অন্য কারো থেকে নেননি; এটা আমি পাইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অনেকে আসতেন, যেমন হযরত সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং বিভিন্ন সিয়াসী ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবুল করেছেন; এমন আছে। আবার তিনি বদরের যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে মাশোয়ারা করেছেন৷ রায় বিভিন্নরকম এসেছিল৷

কিন্তু আজ কিছু লোক নির্দিষ্ট লোকদের থেকে মাশোয়ারা নেয়াকে ওয়াজিবের মত বা ফরজের মত বলছেন এটা সম্পূর্ণই ভ্রান্ত, সম্পূর্ণই ভ্রান্ত, সম্পূর্ণই ভ্রান্ত। সাময়িক সময়ের জন্য হযরত উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহু ছয় লোকের একটা জামাত বানিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই ক’জন নিজেরা পরামর্শ করে একজনকে খলীফা বানাবেন। সে সময়ে তাঁদের মনে পড়েছিল যে, একদা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, আজ যদি আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হায়াতে থাকতেন তাহলে কোন পরামর্শ ছাড়াই তাঁকে আমীর বানিয়ে দিতাম।

লা ইলাহা ইল্লাল্লহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহকে ভয় করুন। মরতে হবে। আজ উম্মত কি এক পেরেশানির মধ্যে ডুবে আছে। উম্মতের মধ্যে এই একটি মাত্র জামাতই ছিল যারা ইখলাসের সাথে, ইতমিনানের সাথে মেহনত করছিল। এই জামাতটিও ইখতিলাফের শিকার হয়ে গেল। একটি জামাত ‘শূরা’ ‘শূরা’ বলতে বলতে উম্মতের মধ্যে তোড় পয়দা করছে। আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে দুআ করি, আমার এই বন্ধুদের কাছে আরজ করছি আপনারা ফিরে আসুন। আপনারা ফিরে আসুন। এই শূরার দাবী ছেড়ে আসুন।

আমাকে কেউ বলুন কোন হাদীসে আপনারা পেয়েছেন যে শূরা ছাড়া কোন কাজ চলতে পারবে না? মজলিসে শূরা ফরয বা ওয়াজিব? এই হুকুম আপনারা আমাকে বলুন। আলহামদুলিল্লাহ আমি ৩০ বছর ইফতার ছাত্রদের পড়াচ্ছি। আমার সামনে মাসআলা আছে। আমি কিতাব দেখছি, পড়ছি, শুনছি, উলামায়ে কেরামের সাথে বসছি। আমার এই দলিল প্রয়োজন।

Changed status to publish