ইখতিলাফের সারাংশ – মাওলানা সা’দ

608 views
0

মাওলানা সা’দ সাহেব এটা বলেছেন, ওটা বলেছেন ইত্যাদি। দেখুন, মাওলানা সা’দ সাহেবকে আমরা মাসুম বা নিষ্পাপ হওয়ার কারণে আমীর মানি না। মাওলানা সা’দ সাহেব আমীর এজন্য তিনি মাসুম, এরকমও নয়। নবীগণ বাদে কোন মানুষই ভুলের উর্দ্ধে নয়। এখন কেউ যদি তাঁকে এরকম নিষ্পাপ মনে করে আর বাস্তবে যদি এরকম আচরণ, ব্যক্তি সা’দ সাহেবের কাজ থেকে পাওয়া যায় যা তার ধারণার বিপরীত। আর তাই তাঁর উপর আপত্তি। এটা কেমন হলো। কেননা সাহাবা কেরামদের থেকেও এমন অনেক ব্যবহার, আচরণ আমরা কিতাবে পাই, শুনি। যেমন- উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু কাউকে ধাক্কা মারছেন, আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু কাউকে লাকড়ি দিয়ে পেটাচ্ছেন ইত্যাদি। আমরা বলি তাঁরা সাহাবা, কোন আপত্তি তো করা যাবে না। এমন কি আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজে বলছেন, এই যে আল্লাহর নবী আমাকে নিজের জুতা দিয়ে এই কথা ঘোষণা করতে পাঠিয়েছেন, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাহ বলবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছেন। সুতরাং এতো মাওলানা সা’দ সাহেবের আখলাক সম্পর্কে গেল।

এখন যদি বলা হয় তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের খেলাফ বলেছেন বা আমাদের হানাফী মাসলাকের খেলাফ। তাহলে প্রশ্ন জাগে ঐ সকল আলেমদের কি অবস্থা। যারা তাঁর পক্ষে জবাব দিয়ে চলেছেন। মাজাহেরে উলূম, সাহারানপুর। সেখান থেকে দেওবন্দের ফতোয়ার উপর জবাব দেওয়া হলো, ওয়াকফ দেওবন্দ বিল্ডিং উদ্বোধন করানো হলো, লখনৌ এর
এত বড় মাদ্রাসা সেখানে তাঁর বয়ান হলো। মাওলানা সালমান হুসাইন নদভী সা’দ সাহেবের পক্ষে বক্তব্য দিলেন। মুফতী হানিফ নদভী সা’দ সাহেবের পক্ষে কিতাব লিখলেন। মুফতী শাব্বির শাহী মুরাদাবাদী। এত বড় মাদ্রাসা মুরাদাবাদে। এত বড় আলেম যিনি, আহলে হাদিসের বিরুদ্ধে অনেক কিতাব লিখেছেন।
সাদ সাহেবের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন, মুফতী সালমান মানসুরপুরী। যার কিতাবুল নাওয়াজিল, কিতাবুল মাসায়েল এর মত কত বড় বড় কিতাবের লেখক। এখন মাওলানা সা’দ সাহেবের আখলাকের লাইনের বিষয় ছেড়ে দিয়ে যদি এই বিষয় দেখি, যে তাঁর বয়ান আকায়েদ, ভুল মাসাআলা দিয়ে পূর্ণ তাই ফতোয়া এসেছে। তাহলে এই উলামাদের কি অবস্থা হবে যাঁরা তাঁর পক্ষে বলছেন। আমার একথা বলার উদ্দেশ্য যে, যে শিয়াদের কুফরী আকিদার কথা মেনে নেয়, সেও কাফির। ঠিক কি না! যে বেরলভী বেদাতিদের তায়ীদ করবে। সেও বেদাতি। যদি কোন দেওবন্দী আলেম বলেন ফাযায়েলে আমল ভুল, আহলে হাদীস সঠিক। তো সেই আলেমকে আপনি কি বলবেন? সে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে খারিজ (বের) হয়েছেন। তাহলে কেন মাজাহেরে উলূমের বিপক্ষে কেন ফতোয়া আসছে না। সেই সকল আলেম যারা মাওলানা সা’দ সাহেবের পক্ষে কথা বলেছেন। বিভিন্ন আপত্তির জবাব দিচ্ছেন। কেন তাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত থেকে খারিজ হয়েছেন, তাঁরা নবীর শানে বেয়াদবি করি পক্ষে নেওয়ার জন্য তাঁরাও বেয়াদবি করেছেন। এরকম ফতোয়া আওতায় তাঁদের এনে দেওবন্দের ফতোয়া আশা উচিত।

দেখুন যে জিনিস পরিষ্কার হয়, তা সূর্য্যের আলোর মতো পরিষ্কার হয়। কাদিয়ানী, বেরলভী, বেদাতি এঁদের গোমরাহী পরিষ্কার নিশ্চিত। কোন দেওবন্দী আলেম এদের পক্ষে কথা বলেন না। মাওলানা সা’দ সাহেব সত্যিকার আহলে সুন্নাত থেকে সরে যাচ্ছেন, বা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হতে চলেছে? তাহলে উলামায়ে দেওবন্দ কেন তাঁর পক্ষে কথা বলেছেন? মাওলানা সালমান মাজাহেরী দেওবন্দের ফতোয়ার উপর জবাব হিসেবে মুস্তাকিল কিতাব লিখেছেন।

আমার বলার উদ্দেশ্য এখানে তিনটি বিষয়। যথা:
১. সা’দ সাহেবের আখলাকের সাথে সম্পর্কিত।
২. সা’দ সাহেববের বয়ান সংশ্লিষ্ট।
৩. শূরা (কমিটি) বনাম ইমারাত (আমীর)।

১. অনেকের সাথে আলাপ করে জানা যায়, তাঁকে মাওলানা সা’দ সাহেব ধমক দিয়েছিলেন। তাঁর দ্বারা কোন কষ্ট পেয়েছেন। কারও হাত হতে মাইক নিয়ে নিয়েছেন ইত্যাদি। আর এজন্য যদি আপনি মারকাজ ছেড়ে থাকেন। তাহলে তা আপনার ব্যক্তি সা’দের সাথে বিরোধিতা। এরকম আপত্তির জবাব হচ্ছে, কেন মানুষ উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খারাপ আখলাকের মানুষ বলে না? কেন আবু যার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেই আচরণে আপত্তি করে না? সুতরাং যদি কেউ দেখে সা’দ সাহেব কার উপর শক্তি দেখাচ্ছেন, তাহলে সার্বিক বিষয় না জেনেও যদি ধরি তাঁর আচরণ আপত্তিকর। এতে ১৯৯৫ সালে মাওলানা সা’দ সাহেবকে জিম্মাদার বানানো তো বাতিল হয়ে যায় না। এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের আমীর যদি একজন হাবশী গোলামও হয়, যে পঙ্গু হয়, যার মাথা কিসমিসের মতো হয়, তবুও তাঁর ইতায়াত কর, মেনে চল। একথার উদ্দেশ্য কি, তোমার উপর যদি আমীরের পক্ষ থেকে কোন মন না চায়, এমন জিনিস আসে, তাহলেও তাকে মেনে চল। কালো, কিসমিসের মতো চেহারা দেখে, কার ভাল লাগবে! আরে দেখ কেমন মানুষ! এখন আমীর তোমাকে কোন শক্ত কথা বলল বা তোমার কাছ থেকে মাইক নিয়ে নিল। তখন বিষয়গুলো তোমার মনের বিরুদ্ধে যাবে, এজন্য হাদিসে বলেছে আমীরকে মান, তাই সে হাবশী গোলাম হোক। তোমাতে মন চায় আর না চায়, আমীরকে মান।

২. দ্বিতীয় বিষয় সেই সকল বয়ান যার উপর ফতোয়া দেওয়া হয়েছে। এই রকম বয়ান হযরত ২০ বছর যাবৎ করে এসেছেন। যেমন- তোমরা কাজ করতে থাক, আল্লাহ তোমার দ্বারা সেই কাজ নিবেন, যা নবীদের দ্বারাও নেননি। এই বয়ান তো তিনি ২০ বছর ধরে করেছেন। আমার মহল্লার সাথী এই বয়ান করতেন। আমি নিজে ধরতাম, তোমরা এমন কথা কেন বল? তারা বলতেন, মাওলানা সা’দ সাহেব বলেন। আমি বললাম, কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিতে পারবেন। তোমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তুমি কি উত্তর দিবে! তো তখন কেউ তো ফতোয়া চায়নি, মাওলানা সা’দ সাহেবের বিরুদ্ধে দেওবন্দ থেকে। যারা মারকাজ ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁরাও বয়ান শুনেছেন, ভাই ফারুক ব্যাঙ্গালোরী। মাওলানা আব্দুর রহমান। কেন তাঁরা কি মাওলানা সা’দ সাহেবের বয়ান ২০ বছর থেকে শুনেননি! এখন বয়ানে কি এমন পরিবর্তন এসেছে যে এখন কেন ফতোয়া দেয়া হলো। এই মুন্তাখাব হাদীস তো ২০০০ সাল থেকেই চলে এসেছে। এখন কেন ফতোয়া এসেছে এর উপর? এটা ভিন্ন বিষয় অন্য সময় আলোচনা করা যাবে। (আগস্ট আল ঈমান বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে)। মোবাইল নিয়ে নামায আদায়। হযরত আজ থেকে এই বয়ান করছেন না। ২০ বছর তাঁরা (বর্তমানে শূরাপন্থীরা) মোদাহীন বা ধর্মের বিষয়ে তাল মিলিয়ে চলনেওয়ালা ছিলেন! তারা এগুলো শুনে চুপ ছিলেন। আল্লাহর নবী বলেছেন যারা দ্বীনের ব্যাপারে তাল মিলিয়ে চলে তারা জাহান্নামী।
আর যদি সত্যি এই কথাগুলো ভুল হতো, তাহলে মাজাহির, অন্য আলমে দ্বীন এর জবাব দিতেন না। তাই এই দ্বিতীয় বিষয়টিও সঠিক নয়।

৩. এখন তৃতীয় বিষয়- এই বিতর্ক তো এমন বিষয় যা তাবলীগের ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট। এই বিষয়ে দেওবন্দ বা অন্য কেউ কিছুই বলেননি। এটা একান্ত তাবলীগের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আর সাধারণ সাথীও বুঝবে। ১৯৯৫ সালে এক আমীরের স্থলে তিন আমীর নির্ধারণ করেন। (সেই সময়ে বাংলাদেশে প্রকাশিত আত তুরাগ পত্রিকাতে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে তিন ইঞ্জিনের সাথে)। যদি শূরাই আসল হবে তাহলে ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল (মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকাল পর্যন্ত) আপনারা শূরা কেন পূর্ণ করলেন না। আর মাওলানা ইজহারুল হাসান রহঃ তো দুই বছর পরে ১৯৯৭ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর স্থানও পূরণ করা হয়নি। এই সুদীর্ঘকাল (১৯ বছরের বেশি) কেন আলমী শূরা বানানোর খেয়াল বর্তমান বিদ্রোহী আপত্তি উত্থাপনকারীদের এলো না!
এখন যে তাঁরা ঐ শূরা পূর্ণ করেছেন বলছেন, তা একজন আমীরকে নির্ধারণ করার জন্য বানানো হয়েছিল। মাওলানা সা’দ সাহেব সেই শূরা কর্তৃক বানানো তিন জিম্মাদারের একজন। যিনি বেঁচে আছেন। এমন না যে তিনি নিজে আমীর হয়েছেন। এটা তো সে রকম হলো যখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন যে জায়েদ ইন্তেকাল করলে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওহাকে আমীর বানাবে ইত্যাদি।

আল্লাহ ভালো জানেন এই লোকদের জেহেনে কি পর্দা পড়ে রয়েছে। তাঁরা ২০১৪ সাল পর্যন্ত কোন আপত্তি করেননি। যেই যুবায়েরুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকাল হয়ে গেল অমনি আপত্তি শুরু করে দিলেন। আর যদি বলেন, আমরা আগে থেকেই আপত্তি করে আসছিলাম। বহুত আগে থেকে সমস্যা ছিল। তাঁরা অনেক সময় এটাও বলেন যে, সা’দ সাহেবের সমস্যা আগে থেকেই ছিল। তাহলে তো আপনারা সকলে মুদাহীন ছিলেন। এক লোক নিজে আমীর হয়ে গেছেন, শরীয়তের খেলাপ বয়ান ও কাজ করছেন, ইলিয়াস রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাজের ক্ষতি করছেন। আর আপনারা নীরবে সহ্য করলেন! আপনারা মুদাহীন!! আবার বলনে যে, না… সীমা অতিক্রম হয়ে গিয়েছিল। ২০১৪ সালে সা’দ সাহেব একা হয়ে গেলেন। এতদিন মুহাদিন ছিলেন আর মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহঃ ইন্তেকাল করার পর মাত্র ১ বছরের মধ্যেই বলেন ফেললেন, সা’দ সাহেব সীমা অতিক্রম করে ফেলেছেন! এই এক বছরে মাওলানা সা’দ সাহেব কোন গুনাহ করেছেন? তাবলীগে কি নতুন বিষয় চালু করেছেন?

এখনও নিজামুদ্দিনে সা’দ সাহেব তথা আমীরের জন্য শূরা রয়েছে। সে শূরা যারা এখন নিজামুদ্দিন ছেড়েছেন তাঁদের সামনে ভাই ফারুক সাহেব ব্যাঙ্গালোরী নিজের হাতে লেখেন এবং সকলে সই করেন।

১৫ নভেম্বর ২০১৫ সালে যখন কথিত আলমী শূরা এক রুমের মধ্যে গঠিত হয় যা মাওলানা সা’দ বাতিল করেছিলেন, (মাওলানা তারিক জামিল সাহেবের কথা ইউটিউব ভিডিও শুনুন) সেখানে ভাই আব্দুল ওহাব রহঃ ছিলেন না, এর উপর সকলে একমত ছিলেন না। প্রাথমিক ভাবে যে নাম প্রস্তাবিত শূরার জন্য করা হয়েছিল সেই মজলিসে মাওলানা সা’দ সাহেব, ভাই হাজী আব্দুল ওহাব সাহেব, বাংলাদেশের শূরা হযরত কেউ ছিলেন না। এমনকি পরে বাংলাদেশ শূরা হযরতরা সা’দ সাহেবের সই নেই মর্মে তা বাতিল করে দেন। সই দেননি। বিস্তারিত সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম ভাই এর খোলা চিঠি যা ইউটিউবেও পাওয়া যাবে দেখুন। সেখানে ঐ লিস্টে তাঁর নামও ছিল।
আর এই ঘটনার এক অডিও আপনি হয়তো শুনেছেন যখন মাওলানা সা’দ সাহেবকে যখন এই শূরা মেনে নেওয়ার জন্য বলা হল, তখন তিনি বললেন এর কোন প্রয়োজন নেই। কারণ তিন জায়গায় (হজ, রায়বেন্ড, টঙ্গী) আমরা সকলে একত্রিত হয়ে আলমী মাশোয়ারা সেরে নেই। এছাড়া সব জায়গায় নিজস্ব শূরা রয়েছে। তখন বলা হল নিজামুদ্দিনে নেই। মাওলানা সা’দ সাহেব বলেন, সেখানে সকল বিষয় মাশোয়ারা করে করা হয়। যেখানে এক দেড় শত লোক শরিক হয়। বলা হল, না! অন্য দেশের মত শূরা নেই। মাওলানা সা’দ সাহেব বলেন, ঠিক আছে আমরা এবার যেয়ে বানিয়ে নিব। তো মূলত তাঁদের পীড়াপীড়িতে ৮ ডিসেম্বর ২০১৫ নিজমুদ্দিনে শূরা গঠন করা হয়। যা ভাই ফারুক ব্যাঙ্গালোরী নিজে লিখেন এবং দস্তখত করেন। এর মানে হল নিজামুদ্দিনে বানানো এই শূরা সবাই একমত হয়ে সই করেন।

উপরোক্ত আলোচনায় একথা প্রমাণিত যে, মাওলানা সা’দ সাহেবের আখলাক বা বয়ানের বিষয়সমূহ নয় বরং পাকিস্তানে বানানো অবৈধ শূরা পদ্ধতি এই ইখতিলাফের মূল। তাই এর পৃষ্ঠপোষকতা নয়, বরং পরিত্যাগ করার মধ্যেই এই সমস্যার সহজ সুন্দর সমাধান।

Changed status to publish