শরঈ দৃষ্টিতে ইমারত ও শূরা; প্রসঙ্গ মাওলানা সাদ সাহেব।

শরঈ দৃষ্টিতে ইমারত ও শূরা; প্রসঙ্গ মাওলানা সাদ সাহেব।

(মুফতি মেহবুব সাহেব দামাত বারকাতুহুম এর বয়ান অবলম্বনে।

মুফতি মেহবুব সাহেবকে বলা হয় ইউরোপের হানাফীদের মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য আলেম। যে সকল হযরতগণ দাওয়াত, তালীম ও খিদমত সমান ভাবে নিয়ে আগাচ্ছেন মুফতি মেহবুব সাহেব এই বিরল আলেমদের একজন।

তিনি গত ৪০ বছর যাবৎ এই কাজের সাথে লেগে আছেন। তিনি হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহির খুব প্রিয়পাত্র ছিলেন। এছাড়া হাফেজ প্যাটেল সাহেব, মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সহ বহু মুরুব্বীর খিদমত করেছেন। রহিমাহুমুল্লাহ।

তিনি সম্প্রতি মাওলানা সাদ সাহেবের পক্ষে যে কোন ব্যাপারে ওপেন চ্যালেঞ্জ করেছেন।)

*** সারাংশ ***
১. একক স্থায়ী আমীরের প্রয়োজনীয়তা।
২. শূরার উদ্দেশ্য।
৩. মাওলানা সাদ কিভাবে আমীর হলেন।
৪. মাওলানা ইজহারুল হাসান, যুবায়েরুল হাসান রহিমাহুমুল্লাহ এবং সাদ সাহেবের অতি সংক্ষিপ্ত জীবনী।
৫. কথিত আলমী শূরার কিছু সদস্যগণের ব্যপারে পূর্ববর্তী আকাবিরদের দৃষ্টিভঙ্গী।
৬. দাঈ গণের প্রতি মুফতী মেহবুব সাহেব দামাত বারকাতুহুম এর ৮ টি উপদেশ।

** দাওয়াতের মেহনত এবং এর পদ্ধতি **
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন যে, তাঁর পরে পুণ্যবান খলীফাগণের সুশাসন হবে। এরপরে আসবে ন্যায়পরায়ণ বাদশাহদের রাজত্ব। অতঃপর আসবে স্বেচ্ছাচারী শাসকগণ। তাদের শোনা এবং মান্য করা ততক্ষণ পর্যন্ত ওয়াজিব, যতক্ষণ না হারাম কাজের নির্দেশ দেয়। বিভেদ সৃষ্টি কর না এবং এতে দ্বীন ক্রমাগত প্রসার লাভ করবে এবং খেলাফত প্রতিষ্ঠিত থাকবে। (আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাও এমনই। উসমানীয় খিলাফতের সময়কার খলিফাগণ আগের দিনের তুলনায় বলতে গেলে ফাসেক ছিলেন। এরপরও ইতায়াত এবং ঐক্যের বরকতে ঐ সময়ে ইউরোপে দ্বীন প্রসার লাভ করেছে।)

এই হাদীস খানা আবু দাউদ শরীফ এবং অন্যান্য আরও কিছু কিতাবে মোটামুটি কাছাকাছি শব্দে বর্ণিত হয়েছে।

কিয়ামত পর্যন্ত এটাই দাওয়াতের পদ্ধতি। এই হাদীসে ইমারত বা বাদশাহী ইত্যাদির উল্লেখ আছে। কথিত শূরার কোন উল্লেখ নেই। কেননা কারো কথা শোনা বা মানা, এটা কেবল এক ব্যক্তির সাথেই সম্পৃক্ত করা যায়। এর প্রমাণ এই হাদীস থেকেই বের করা যায়। এটা কি সম্ভব যে ২০, ৫০ বা ১০০ জনের শূরা প্রত্যেককে মান্য করব? (প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা মানুষ। চিন্তা ভাবনা, ধ্যান ধারণা, তাকওয়া, সবর, দূরদৃষ্টি, অন্তর্দৃষ্টি সবার এক হবে না। এছাড়া দ্বীনের ব্যাপারে সবার বুঝ বিশ্লেষণ ক্ষমতাও এক হবে না।)

আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে মান্য করা এজন্যই সহজ যে, তিনি এক এবং একক। এজন্যই কুরআন শরীফে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য থাকত তাহলে অবশ্যই এর পরিণাম হত দুই উপাস্যের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও দুর্নীতি। (জিম্মাদারীর সবচেয়ে বড় ব্যবস্থাপনা হল রব বা ইলাহ। সেখানেই আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যৌথ নেতৃত্বের পরিণতি হিসাবে দুর্নীতি ও দ্বন্দ্ব উল্লেখ করেছেন। সেখানে আলমী শূরা যৌথ নেতৃত্বের আর কি দলীল থাকতে পারে। এরও শেষ পরিণতি নেতাদের কোন্দল, দুর্নীতি এবং পরিশেষে এই মহান মেহনতের পরিসমাপ্তি।)

আল্লহর আনুগত্য এবং এবং আমীরের আনুগত্য একই সুতায় বাঁধা। বিভিন্ন হাদীসের কিতাব থেকে এটাই পাওয়া যায়, যে আমার আমীরের আনুগত্য করে সে আমার আনুগত্য করে। আর যে আমার আনুগত্য করে সে আল্লহর আনুগত্য করে।

কত গুরুত্বপূর্ণ এবং কত পরিষ্কার এই হাদীস। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই হাদীস খানা যত গুরুত্বের সাথে নেয়া দরকার ছিল, সাধারণ মানুষজন তত গুরুত্বের সাথে নেয় নি। অনেকের কাছে হয়তো এই প্রথমবার এই হাদীস পৌঁছেছে। মূল্যবান এই হাদীসেই দাওয়াতের পদ্ধতি ও মানহাজ বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লেখিত এই হাদীসের ভাষা খুবই পরিষ্কার… শোন এবং মান।

এর বিপরীতে ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি, এই হাদীস সকলেই জানি, যেহেতু বিভিন্ন জলসা, মিম্বরে এবং অন্যত্র এই হাদীস প্রচুর বলা হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বহুল প্রচারিত হাদীসের কারণে তাদের দ্বীন সম্পর্কে ধারণা শুধুমাত্র ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ এই হাদীসে শুধুমাত্র তথ্যই দেয়া হয়েছে। পরিষ্কার কোন আদেশ বা নিষেধ কিছুই এই হাদীসে নেই। অথচ প্রথমে উল্লিখিত হাদীসে পরিষ্কার ভাষায় নির্দেশ দেয়া আছে যে, উম্মতের ঐক্য রক্ষায় স্বার্থে বাদশাহ, শাসক বা আমীর যেই থাকুক মেনে চলা।

সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনের স্তর যতটুকু হবে, তাদের মধ্যে দ্বীনি এলেমের স্তরও ততটুকুই হবে। দুঃখজনক তো এই, সাধারণ মানুষ দ্বীন বলতে নামায রোজা এমন কয়েকটি ইবাদতের সমষ্টিই বুঝে। তাই শুধু ইবাদতের হাদীসগুলোই তারা জানে। আমীরের ইতায়াতের হাদিস তাদের সামনে নেই।

** শূরা **
শূরা আমীরের বিকল্প নয়। বরং আমীর মনোনীত করার জন্য। যদি কেউ বলে যে মাসোয়ারার একজন ফয়সাল আছেন এবং তিনিই আমীরের মত, এটা ভুল কথা। কারণ ফয়সালের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শুধুমাত্র মাসোয়ারার মধ্যেই সীমিত। যখন মাসোয়ারা শেষ হয়ে যায়, তার ইমারতও শেষ হয়ে যায়।

পূর্বে উল্লিখিত হাদীসে যে আমীরকে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে তা হল সব সময়ের আমীর। এমন আমীর যে কিনা ২৪ ঘন্টায় যে কোন উমুরের জন্য উদ্বিগ্ন এবং সচেতন থাকেন। যারা দাবি করেন মারকাজে সাপ্তাহিক বা মাসিক ফয়সাল থাকবেন, তাদের দাবী অজ্ঞতাপ্রসূত। তাদের শরীয়তের হুকুম অথবা দাওয়াতের পদ্ধতি এবং সীরত সম্পর্কে নূন্যতম ধারণাও নেই। সুনিশ্চিত ভাবে তারা পদ আকাঙ্খী ছাড়া কিছুই নন। (দ্বীনের জিম্মাদারীকে তারা পদ মনে করে বসে রয়েছেন।)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পূর্বে দশ জন সাহাবীকে বিশেষ ভাবে সম্মানিত করে যান। তাঁদের আশারা মুবাশশারা বলা হয়। রাদিয়াল্লাহু আনহুম। এ কথা প্রশ্নাতীত যে তাঁরাই এই উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত ছিলেন। এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁদের পরামর্শ বিশেষ ভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে বলেই সীরতের কিতাবসমূহে পাওয়া যায়। সে হিসাবে তাঁদের শূরা হিসাবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। পরবর্তী খলিফাগণ এদের মধ্যে থেকেই হয়েছেন।

*** নিজামুদ্দিন মারকাজে মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত প্রতিষ্ঠা।
হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইন্তেকালের পূর্বে তাঁকে বললেন দুআ ও মেহনতের দ্বারা নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। তাঁর (হজরতজী) পরে তাঁকেই (মাওলানা সাদ) এই জিম্মাদারী নিতে হবে। মাওলানা সাদ সাহেব তাঁকে আরো গভীর ভাবে বিবেচনার অনুরোধ জানান। আপনি আমাকে আমীর মনোনীত করলে মাওলানা যুবায়ের সাহেবের মুহিব্বীনগণ কষ্ট পাবে। আবার মাওলানা যুবায়ের সাহেবকে আমীর মনোনীত করলে কিছু লোক আপনাকে দোষারোপ করতে পারে। হজরতজী ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি উত্তর করেন, তাহলে মাওলানা ইজহারুল হাসান সাহেব তোমাদের দুজনের তত্ত্বাবধায়ক থাকবেন। রহিমাহুমুল্লাহ। তোমরা তিনজন সম্মিলিত ভাবে এই মারকাজ এবং মেহনতের জিম্মাদারী সামলাবে।

মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেব, মিয়াজী মেহরাব সাহেব এবং না’ঈমুল্লাহ খান সাহেব এই কথপোকথন সম্পর্কে অবগত ছিলেন। রহিমাহুমুল্লাহ। পরবর্তীতে হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের পরে তাঁর বানানো জামাত কোন একক আমীর মনোনীত করতে ব্যর্থ হলে তাঁরা হজরতজীর ঐ আশা বাস্তবায়ন করেন। এভাবে পূর্বল্লখিত তিনজনকে মারকাজ এবং এই মেহনতের জিম্মাদারী অর্পণ করা হয়। বিস্তারিত নীচে পাদটিকায়।

পাঠকদের দিলের প্রশান্তির জন্য এই তিন হযরতের কিছু বৈশিষ্ট্য ও কর্মধারা সম্পর্কে জানা জরুরি।

(ক) মাওলানা ইজহারুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ। দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি কাশিফুল উলূম মাদ্রাসার জিম্মাদারী সামলাতেন। এছাড়া মারকাজের মসজিদওয়ার জামাতের জিম্মাদারীও তাঁর উপরে ছিল। (এই দায়িত্বকে আমাদের প্রচলিত মসজিদগুলোর সেক্রেটারির সাথে তুলনা করা যায়। অর্থাৎ তিনি মারকাজের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।) এছাড়া প্রতিদিন রাতে তিনি মিম্বরে হায়াতুস সাহাবাহ পড়তেন। হায়াতের একটা লম্বা সময় ধরে তিনি এই দায়িত্বগুলো সামলিয়েছেন। এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দায়িত্বসমূহ পালন করেন।

(খ) মাওলানা যুবায়েরুল হাসান সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি বেশ ভারী ছিলেন। এবং শারীরিক ভাবে খুব একটা সক্ষম ছিলেন না। তিনি মোটামুটি সারাক্ষণ দুআ এবং যিকিরে মশগুল থাকতেন। ১৯৮০ সালের হজ্জ সফরে শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা যাকারিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রায় বেশির ভাগ সময় তাঁকে সাথে সাথে রাখেন। এবং এক পর্যায়ে তাঁকে খিলাফত দান করেন। যখন তিনি মারকাজে ফেরত আসেন তখন আমি সেখানে ছিলাম। আমি তাঁর হাবভাবের মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা দুআ কান্নাকাটিতে মশগুল থাকতেন। ফলশ্রুতিতে তাঁর ভারী হয়ে যায়। (এ কথা পরিষ্কার যে মাওলানা সাদ সাহেবের উপর জিম্মাদারী অর্পণের উদ্দেশ্যেই শায়খুল হাদীস রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর মেহনতের রুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন।)

(গ) মাওলানা সাদ সাহেব দামাত বারকাতুহুম ছিলেন প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক কর্মচঞ্চল তরুণ। হজরতজী তাঁকে শুরু থেকেই বিভিন্ন সফরে নিজের সাথে নিয়ে চলতেন। মূলতঃ তাঁর আশীর্বাদেই মাওলানা সাদ সাহেব দাওয়াতে তাবলীগের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে একেবারে কচি বয়স থেকেই পরিচিত ছিলেন।
তাই প্রধানত সাদ সাহেবই আমীরের দায়িত্ব পালন করতেন।

২০১৪ এর আগে পর্যন্ত মাওলানা আহমাদ লাট সাহেব এবং ভাই ফারুক সাহেব (ব্যাঙ্গালোর) তাঁদের কখনো মাওলানা সাদ সাহেবের প্রশংসায় ক্লান্ত হতে দেখা যায় নি। হাফিজহুমুল্লাহ।

সকল আরব হযরতগণ এ কথা স্বীকার করেছেন যে তাঁরা মাওলানা সাদ সাহেবের বয়ানে স্পন্দিত হন, এবং তাঁর বয়ান তাঁদের মাওলানা ইউসুফ রহমাতুল্লাহি আলাইহির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

শুধু ভারতবর্ষই নয় বরং সমস্ত দুনিয়া তাঁর কথা পছন্দ করত। এবং যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর পারদর্শীতা সবাইকে মুগ্ধ করত।

মাওলানা ইজহারুল হাসান এবং মাওলানা যুবায়েরুল হাসান রহিমাহুমুল্লাহ খুশি মনে তাঁর ফয়সালাকৃত সিদ্ধান্ত মেনে চলতেন এবং সহযোগিতা করতেন। এভাবেই সাদ সাহেবের নেতৃত্বে সব কিছু সুন্দর ভাবে চলছিল। এবং সারা দুনিয়ার লক্ষ লক্ষ পুরাতন সাথী এবং নিজামুদ্দিন মারকাজের প্রায় ১৫০ জন পুরাতন মুকিমীন হযরত আনন্দচিত্তে মাওলানা সাদ সাহেবকে আমীর হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। মানতে পারেননি শুধু চারজন
১. মাওলানা আহমাদ লাট
২. ভাই ফারুক
৩. প্রফেসর খালিদ সিদ্দিকী
৪. প্রফেসর সানাউল্লাহ
হাফিজহুমুল্লাহ

এই চারজন শূরা বানানোর ইস্যু উঠান এবং তাঁদের এই দাবী শক্তিশালী করতে বিভিন্ন ভাবে মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা এবং মাওলানা ইয়াকুব সাহেবকেও দলে ভিড়ান। হাফিজহুমুল্লাহ। যদিও পরের জন খুব অল্প সময় পরেই মারকাজে ফিরে আসেন এবং এখনো অবস্থান করছেন।

এই জাতীয় শূরা বানানোর অধিকার বড়জোর শুধু দুই জনই রাখেন। হাজী আব্দুল ওয়াহাব সাহেব এবং মাওলানা সাদ সাহেব। দামাত বারকাতুহুম। (উল্লেখ্য ২০০০ সালে তাঁদের মধ্যে সম্পাদিত এক অঙ্গীকারনামার কারণে হাজী সাহেবও একক ভাবে এই অধিকার রাখেন না। মূলতঃ পাকিস্তানের হযরতগণ বিভিন্ন সময়ে নিজামুদ্দিনকে পাশ কাটিয়ে স্বাধীন ভাবে মাঝে মাঝেই কিছু নতুন রীতি চালু করতেন, এটা বন্ধ করারই এই অঙ্গীকারনামার উদ্দেশ্য ছিল।)

প্রথম জন বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে অনেকটাই মাসুম শিশুর মত হয়ে গেছেন, অন্যের দয়ার উপর নির্ভর করতে হয় এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে তিনি মজুর। মাওলানা সাদ সাহেব নিজামুদ্দিনের জন্য শূরা বানান যারা দৈনিক মিলিত হয়ে মেহনত সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিবেন।

এই দুইজন বাদে না কেউ কোন শূরা বানাতে পারেন আর না মারকাজ বানাতে পারেন। হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১০ জনের জামাত বানান তখন এই ইব্রাহীম সাহেব বা আহমাদ লাট সাহেব বা ফারুক ভাই এঁদের কাউকেই অন্তর্ভুক্ত করেন নি। হাফিজহুমুল্লাহ। এটা ছিল আল্লহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে। এসব বিদ্রোহীদের ঐ জামাত বা শূরাতে অন্তর্ভুক্ত করলে এঁরা কেয়ামত ঘটিয়ে ফেলত। হজরতজী এবং মিয়াজী মেহরাব সাহেব, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁদের দূরদৃষ্টি এবং অন্তর্দৃষ্টি দান করেছিলেন। রহিমাহুমুল্লাহ। তাঁরা জানতেন এই উপদ্রব সৃষ্টিকারী লোকগুলো এমন একটা মহান দায়িত্ব পালনের উপযোগী নন। (মুমিনদের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় কর, কেননা তাঁরা আল্লহর নূর দ্বারা দেখেন।) অবশেষে এই লোকগুলো প্রমান করলেন যে, আজকের বাস্তবতা সেদিনই হজরতজী এবং মিয়াজীর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। রহিমাহুমুল্লাহ। এটা সম্ভব নয় যে, হজরতজী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইচ্ছাকৃতভাবে মাওলানা ইব্রাহীম দেউলা এবং মাওলানা আহমাদ লাট সাহেবকে উপেক্ষা করেছেন। হাফিজহুমুল্লাহ। বরং আমাদের সম্মানিত মুরুব্বীগণ যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে প্রতিনিয়ত ইস্তেখারার এহতেমাম করতেন।

মিয়াজী মেহরাব সাহেব, যিনি ঐ মাসোয়ারার ফয়সাল ছিলেন, এই দুই হযরতের কারো নাম উচ্চারণ করেন নি। এমন কি মাওলানা সাঈদ আহমাদ খান সাহেবও নন। রহিমাহুমুল্লাহ। সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হল, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর একজনের নামও হজরতজী মাওলানা ইনআমুল হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ১০ জনের জামাতের মধ্যে রাখেন নি। তা সত্ত্বেও এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা যাতে নিজামুদ্দিন বন্ধ হয়ে যায়, দাওয়াতের এই মোবারক মেহনত খতম হয়ে যায়, ইমারত অপসারণ হয় এবং মারকাজের একশ বছরের জোড় মিল মুহাব্বত ধ্বংস হয়ে যায়। যেহেতু এই মারকাজের চার দেয়ালের অভ্যন্তরীণ আমলের সাথে তাঁদের কোন অংশগ্রহণ নেই, তাই তাঁরা কিছুই অর্জন করতে পারবে না। তাঁদের উদাহরণ উর্দু সেই শেরের মত, বিয়ে বাড়িতে কতই না ফুর্তি, কিন্তু অপরিচিত আব্দুল্লাহ যে এখানে বড়ই একা!

এই গোষ্ঠী যেহেতু নিজেরাই বিদ্রোহ করেছে, তাই এরা আর মারকাজের শূরা নন। এমনকি মারকাজ বা মাদ্রাসা কোন কিছুর সাথেই তাঁরা আর জড়িত নন। তাই যারা নিজেদের দাওয়াত ও তাবলীগের এই মহান মেহনতের সাথে জড়িত মনে করেন তাদের জন্য নিচের কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক:

১. নিজামুদ্দিন আমাদের মারকাজ। আমাদের সমস্ত কাজ নিজামুদ্দিনের হেদায়েত অনুসারেই করতে হবে।

২. মাওলানা সাদ সাহেবই তাবলীগের কাজের সারা দুনিয়ার আমীর।

৩. কেবলমাত্র মাওলানা সাদ সাহেবের নির্দেশনা এবং মানসাই অনুসরণ করতে হবে।

৪. মারকাজের বর্তমান শূরাই প্রকৃত শূরা।

৫. বিশ্বের সকল মারকাজই নিজামুদ্দিন মারকাজের আজ্ঞাবহ। তাঁদের দায়িত্ব শুধু মাওলানা সাদ সাহেবের মাসোয়ারাকৃত নকশা বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমিত। (ফাজায়েলের পাশাপাশি তাই মুন্তাখাব আহাদীসের তালীমও চালু রাখা।)

৬. আঞ্চলিক কোন স্বার্থ বা চাহিদা মারকাজ বা কেন্দ্রীয় অনুমোদনের উর্ধে নয়। এটাই মারকাজিয়াত বা কেন্দ্রের আনুগত্যের সংজ্ঞা। মারকাজ থেকে বাতানো আমল গুলোর মধ্যে কিছু করা কিছু বাদ দেয়া, এটা মারকাজ প্রত্যাখ্যান করা এবং আমীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল।

৭. সমগ্র দুনিয়া অবশ্যই মুন্তাখাব হাদীসের তালীম করবে। এবং দিল মন পাক করে যে কোন উমুর হজরতজী মাওলানা সাদ সাহেবের সামনে পেশ করবে, এবং যে ফয়সালা নিজামুদ্দিনে হবে তাই স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।

৮. আমীরের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আমার আমীরের আনুগত্য করবে সে আমার আনুগত্য করে। যে আমার আনুগত্য করে সে আল্লাহর আনুগত্য করে।

মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত প্রত্যাখ্যান করা সুনিশ্চিত ফিৎনা, জুলুম এবং সিরতল মুস্তাকীম হতে বিচ্যুতি।

ইমারত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অস্বীকার করা নিজেকে বঞ্চিত করার সামিল। খুবই সামান্য কিছু বাদে, সমগ্র দুনিয়া মাওলানা সাদ সাহেবের ইমারত কবুল করে নিয়েছে। এসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের বুঝানোর চেষ্টা হয়েছে কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই উম্মতকে এদের দূষিত দুরভিসন্ধি থেকে হেফাজতের জন্য এদের আখলাকের সাথে পাশ কাটিয়ে চলতে হবে।

কুরআন কারীমের আয়াত, “জান্নাতের ঘর শুধু তাদের জন্য যারা দুনিয়াতে কোন পদ চায় না। এবং তারা দুনিয়াবী কোন পদ বা নেতৃত্ব লাভের জন্য ফাসাদ করে না। মুত্তাকীদের পরিণাম সর্বোত্তম।” (সূরাহ কাসাস)

আমলের রূহ হল আন্তরিকতা। আন্তরিকতা বিহীন আমল জীবনবিহীন লাশের মত। এর কোন মূল্য আছে?

মুফতী মেহবুব
মুসলিম এ্যাডভাইসারী সার্ভিস।