মুসা আঃ এর বিষয়ে সাদ সাহেব যা বলেছেন।




বিষয়ঃ মূসা আলাইহিস সালামের অনুপস্থিতির কারণেই কি বনী ইসরাইলের ৫ লক্ষ ৮৮ হাজার মানুষ গোমরাহ হয়েছে?

দারুল উলূম দেওবন্দের আলোচিত ফতুয়ায় উক্ত বিষয়টিকে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছেঃ

“হযরত মূসা আলাইহিস সালাম নিজ গোত্র ও দলকে ফেলে রেখে (তূর পর্বতে গিয়ে) আল্লাহ তা’আলার সাথে কথোপকথনের জন্য একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতায় মগ্ন হয়ে যান। যার ফলে বনী ইসরাইলের মাঝে ৫ লক্ষ ৮৮ হাজার মানুষ গোমরাহ হয়ে যায়। কারণ, (মূসা ও হারূন আলাইহিমুস সালামের মাঝে) প্রধান ছিলেন মূসা আলাইহিস সালাম। তিনিই ছিলেন দায়িত্বশীল। যিনি প্রধান হোন তাকে সবসময় (আপন কওমের নিকট) থাকতে হয়। আর হারূন আলাইহিস সালাম ছিলেন সহকারী।”

এই বক্তব্যটি যে কাউকে হতভম্ব করে দিতে পারে। কেউ কেউ তো ইতোমধ্যে এমন কথাও বলে ফেলেছেন যে, এই জঘন্য উক্তির দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, তিনি (সা’দ সাহেব)নবীদেরকে হেদায়াতের মালিক হিসেবে গণ্য করেন। নতুবা মূসা আলাইহিস সালামের চলে যাওয়াকে গোমরাহীর কারণ বলা হয়েছে কেন? নাঊযু বিল্লাহ! অজ্ঞতা আমাদেরকে কোথায় নিয়ে ঠেকাচ্ছে?

যাহোক, #এখানে_মোট_২টি_প্রশ্ন পাওয়া গেছেঃ
♥১. হযরত মূসা আলাইহিস সালাম স্বীয় উম্মতকে ফেলে দীর্ঘদিন দূরে থাকার কারণেই বনী ইসরাইলের ৫,৮৮,০০০ মানুষ গোমরাহ হয়ে গেছে। এটি কি সঠিক?
♥২. মূসা ও হারূন হালাইহিমাস সালাম উভয়ই নবী হওয়া সত্যেও একজনকে প্রধান ও অপরজনকে সহকারী বলাটা কি সহীহ?
আপাতত এই পোস্টে শুধুমাত্র ১ম প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

চলুন দেখে নেই, নির্ভরযোগ্য মুফাসসিরীনে কেরামের মধ্যে কে কে ১ম প্রশ্নটিকে সঠিক বলেছেন।

১. হযরত আবদুল ক্বাদের জীলানী (৫৬১ হি.) তাঁর সুবিখ্যাত’তাফসীরে জীলানী’র ৩য় খণ্ডের ১৫৮-১৫৯ পৃষ্ঠায় উক্ত আয়াতের ব্যখ্যায় লিখেন “আল্লাহ তা’আলা মূসা আলাইহিস সালামকে বলেছেন ‘তুমি যখন তাদেরকে রেখে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছো তখন তাদের এই মহাবিপদে পতিত হওয়ার নেপত্থে নিজেই ‘কারণ’ সাব্যস্ত হয়েছো।”

২. শায়েখ নি’মাতুল্লাহ বিন মাহমূদ নাখজাওয়ানী (৯২০ হি.) তাঁর সুবিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ “আল ফাওয়াতিহুল ইলাহিয়া ওয়াল মাফা-তীহুল গাইবিয়া”তে অনুরূপ বক্তব্য উল্লেখ করেছেন

৩. ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (৬০৬ হি.) তাঁর সুবিখ্যাত তাফসীরে কাবীরে উক্ত আয়াতের ব্যখ্যায় লেখেন “মূসা আলাইহিস সালামের দ্রুত যাওয়ার বিষয়টি হয়তো ‘ষিদ্ধ’ ছিলো নয়তো’নিষিদ্ধ’ ছিলো। যদি নিষিদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে তা আল্লাহ তা’আলার অবাদ্ধতা হিসেবে ধর্তব্য হবে। তখন নবীদের দ্বারা গুনাহ করা সাব্যস্ত হয়ে যাবে। আর যদি আমরা বলি যে, তা নিষিদ্ধ ছিলো না তাহলে তা আল্লাহ তা’আলার প্রশ্ন করা (হে মূসা! কোন কারণটি তোমাকে দ্রুত নিয়ে এসেছে) অবান্তর সাব্যস্ত হয়। এই (কঠিন দোটানার) সমাধান হলোঃ সম্ভবত মূসা আলাইহিস সালাম উপস্থিত হওয়ার সঠিক সময়টি সম্পর্কে কোন ‘অবগতিপত্র’ পান নি। তাই ইজতিহাদ করে একটু আগেই চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা ছিলো ভুল সিদ্ধান্ত। তাই আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে মৃদু তিরষ্কৃত হয়েছেন।

৪. শায়েখ ইবনে ‘আদেল হাম্বলী (৮৮০ হি.) তার সুবিখ্যাত ‘আল লুবাব ফী উলূমিল কিতাব’ গ্রন্থে ৩য় মন্তব্যের হুবহু উল্লেখ করেছেন ।

৫. মুফতী ত্বাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহর পিতা মুফতী শাফী হানাফী রাহিমাহুল্লাহ (১৩৯৬ হি.) উর্দূ ভাষায় রচিত তাঁর সুবিখ্যাত তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআনের ৬/১৩৪-এ উল্লেখ করেন “মূসা আলাইহিস সালামের জন্য উচিৎ ছিলো সর্বদা তাঁর কওমের সাথে থাকা এবং তাদেরকে নিজ তত্বাবধানে রাখা। কেননা তিনিই (মূসা ও হারূন আলাইহিমাস সালামের মধ্যে)নবুওয়তী দায়িত্বের অধিক যিম্মাদার। সুতরাং যখন তিনি স্বীয় গোত্রকে ফেলে রেখে চলে গেলেন তখন ফলাফল এই দাঁড়ালো যে, এক সামেরীই সবাইকে গোমরাহ করে ছাড়লো।

আরো যারা উক্ত তাফসীরটি নিজ নিজ কিতাবে উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেনঃ

১. শায়েখ ইবনুল ‘আরাবী (৬৩৮ হি) তাঁর সুবিখ্যাত ‘তাফসীরে ইবনে আরাবী’র ২য় খণ্ডের ৫৫ পৃষ্ঠা।
২. আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহর ছাত্র আল্লামা বুরহানুদ্দীন বাকাঈ আল শাফেয়ী (৮৮৫ হি.) এর সুবিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ “নাযমুদ দুরার ফী তানা-সুবিল আ-য়া-তি ওয়াস সুওয়ার”।
৩. আল্লামা খতীব শারবীনী শাফেয়ী (৯৭৭ হি.) এর সুবিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ “আস সিরাজুল মুনীর”।
৪. কাযী সানাউল্লাহ উসমানী মাযহারী হানাফী (১১২৫ হি.) এর সুবিখ্যাত “তাফসীরে মাযহারী” এর ৬ষ্ঠ খণ্ডের ১৫৬ পৃষ্ঠা।
৫. শায়েখ শিহাবুদ্দীন আলূসী (১২৭০ হি.) এর জগদ্বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ “রূহুল মা’আনী”এর ১৬তম খণ্ডের ২৪১ পৃষ্ঠা।
৬. আল্লামা ইবনে ‘আশূর মালেকী (১৩৯৩ হি.) এর সুবিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ “আত তাহরীর ওয়াত তানভীর”।
৭. শায়েখ আবূ যুহরাহ (১৩৯৪ হি.) এর সুবিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ”যাহরাতুত তাফাসীর”।
৮. মসজিদে নববীর উস্তাযুত তাফসীর শায়েখ আবু বকর জাযাইরী-এর সুবিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ “আইসারুত তাফাসীর”।
৯. উক্ত তাফসীরগ্রন্থের স্বতন্ত্র হাশিয়াগ্রন্থ ‘নাহরুল খাইরে’ও একই কথা তিনি উল্লেখ করেন।
১০. দারুল উলূম দেওবন্দের উস্তাযুত তাসফীর আল্লামা শায়েখ জামালুদ্দীন বুলন্দশহরী স্বীয় তাফসীরগ্রন্থ “জামালাইন”এর ৪র্থ খণ্ডের ২০২ পৃষ্ঠা। 
**********************
প্রিয় পাঠক! ৫টি পূর্ণ বক্তব্যসহ অতিরিক্ত আরো ১০টি উদৃতি পেশ করা হয়েছে। এতকিছুর পরও যদি শায়েখ সা’দ হাফিযাহুল্লাহকে রুজু করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় তাহলে নতুন দু’টি প্রশ্ন এসে সামনে দাঁড়ায়।
১. এই রুজুর আদেশ কি প্রকারান্তে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরীনদের উপর আরোপিত হয় না?
২. নাকি সা’দ সাহেব উক্ত সকল মুফাসসিরীনের ঊর্ধ্বে থাকায় কেবলই তাঁকে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?

এতটুকু পড়ে নিশ্চয়ই আপনি ভাবছেন, তাহলে কেন ‘দারুল ঊলূম দেওবন্দ’ এই বক্তব্যে আপত্তি জানিয়ে ফতুয়া দিয়েছে?

প্রথমতঃ এই জবাব অধম লেখকের জানা নেই।
দ্বিতীয়তঃ উক্ত আয়াতের তাফসীর নিয়ে যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসণের লক্ষে দারুল উলূম দেওবন্দের উস্তাযুল হাদীস আল্লামা হাবীবুর রহমান আ’যমী সাহেব নাতিদীর্ঘ একটি’রিসালা’ লেখেন। যার নাম দিয়েছেন “و ما أعجلك عن قومك يا مويس كي صحيح و معتبر تفسير”

দারুল উলূম দেওবন্দ এবং তাঁর সকল সিদ্ধান্ত ও ফতুয়ার প্রতি পূর্ণ আস্থা, সমর্থন ও শ্রদ্ধা রেখেই বলছি; যদি শায়েখ আযমী সাহেবের (দাবী অনুসারে) উক্ত রিসালায় বর্ণিত ব্যখ্যাগুলোকেই একমাত্র সঠিক মনে করা হয় তাহলে বিগত ১৪শত বছরের বড় বড় বহু মুফাসসিরীনে কেরামকে গোমরাহ বলতে হবে। নাঊযু বিল্লাহ।

সবশেষে পাঠক মহোদয়গণের বিবেকের কাছে আবারো প্রশ্ন থাকলোঃ
১. আসলেই কি এগুলো শায়েখ সা’দ হাফিযাহুল্লাহর ভুল নাকি আমাদের অজ্ঞতা?
২. যদি ভুল হয়েই থাকে তাহলে কি এগুলো কেবলই শায়েখ সা’দ হাফিযাহুল্লাহর উপর বর্তাবে নাকি যারা ১৪শত বছরের ইতিহাসে বারবার এগুলো লিখে আসছেন তাদের উপর বর্তাবে?

আয় আল্লাহ, আমাদের সবাইকে যাবতীয় অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হওয়া থেকে হেফাযত করো। আমীন।