মাওলানা ইলিয়াস রহ. যেভাবে তাবলীগের কাজ শুরু করেছিলেন

তাবলীগ নিউজ বিডিডটকম | হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ. যখন নিযামুদ্দিন মারকাজ গড়ে তোলেন তখন দেওবন্দে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ছিল। হাক্কানী পীর হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ এর খানকা ছিল। ছিলেন আব্দুর রহীম রায়পুরীর মত বিশ্বব্যপী সুপরিচিত পীর।

ইলিয়াস রহ. নিজে পীরবংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং নিজেও একজন পীর ছিলেন। তাঁর পুরো পরিবারই ছিলো বংশগতভাবে বুজুর্গ। প্রতিটি সদস্য, ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, হাফেজে কুরঅান। প্রতিটি পুরুষ আলেম। মা, খালা, বোন, ফুফু নির্বিশেষে সবাই হাফেজা, পরহেজগার। মাওঃ ইলিয়াস রহ. যেহেতু নামকরা বুজুর্গ ছিলেন। পীর ছিলেন। সুতরাং দ্বীনের খেদমতের জন্য তিনি কোনো বড় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করবেন, অথবা কোনো বড় খানকার গোড়াপত্তন করবেন এটাই স্বাভাবিক ছিল। তিনি করেছিলেনও তা। প্রথমে খানকা এবং পরে হেফজখানা খুলেছিলেন। কিন্তু মুরিদ এবং ছাত্রদের আমল আখলাক তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

পরে তিনি দ্বীনের খেদমতের জন্য তৃতীয় ধারার এক মারকাজ প্রতিষ্ঠা করলেন? কি ছিলো এর উদ্দেশ্য ?

হযরত ইলিয়াস রহ. দেখেছিলেন যে, এত বড় বড় মাদ্রাসা থাকা সত্ত্বেও, এত বড় বড় বুজুর্গদের খানকা থাকা সত্ত্বেও “আম তৌড় পর”, “আম ভাবে”, (অর্থাৎ ব্যপকভাবে, ব্যপকহারে) উম্মতের দ্বীনী হালত দ্রুতগতিতে খারাপ হয়ে চলেছে । উম্মতের হাত থেকে দ্বীন ছুটে যাচ্ছে। উম্মতের জীবন থেকে দ্বীন হারিয়ে যাচ্ছে ।

হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,“আমি প্রথমে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছি। তখন ছাত্রদের ভিড় হয়েছে এবং ভালো ভালো যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্ররা আসতে শুরু করেছে। আমি তখন চিন্তা করলাম তাদেরকে নিয়ে আমার মেহনতের ফল ইহা ছাড়া আর কি হবে যে, যারা আলেম হওয়ার জন্য মাদ্রাসাতে আসে তারা আমার কাছে পড়াশোনা করার পর আলেম বা মৌলভী হবে। অতঃপর তাদের কাজ তাই হবে যা আজকাল সাধারণত গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কেহ ডাক্তারি পড়ে ডিসপেন্সারি খুলে বসবে, কেউ ইউনিভার্সিটি তে পরীক্ষা দিয়ে স্কুল কলেজে চাকরি করবে, আবার কেউ মাদ্রাসায় বসে পড়াতে থাকবে। এর চেয়ে অধিক আর কি হবে? এই চিন্তা করে মাদ্রাসায় পড়ানো থেকে আমার অন্তর ফিরে গেল।

এরপর এমন একটি সময় আসলো যে আমার শায়েখ আমাকে খেলাফত দান করে অন্যদেরকে মুরিদ করার অনুমতি দিলেন। আমি তখন মুরিদদের কে জিকিরের তালকীন দিতে শুরু করলাম। আল্লাহ তাআলার মেহেরবানীতে মুরিদদের এত তাড়াতাড়ি হালত পরিবর্তন হতে লাগল এবং এত দ্রুত তাদের উন্নতি হতে লাগলো তাতে আমি নিজেও আশ্চর্য হলাম। তখন আমি চিন্তা করলাম যে, এ কাজে লেগে থাকার ফল কি হবে? বেশির থেকে বেশি কিছু জিকির করনেওয়ালা লোক তৈরি হবে। অতঃপর মানুষের মাঝে তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। কেউ তখন মোকদ্দমায় জিতবার জন্য দোয়া চাইতে আসবে। কেউ সন্তানের জন্য তাবিজ এর আবেদন করবে। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতির জন্য দোয়া করাবে। বেশির থেকে বেশি তাদের দ্বারা ভবিষ্যতে আরও আরও কিছু জাকেরিনদের এক জামাত তৈরি হবে। এই চিন্তা করে সে দিক থেকে আমার মন ফিরে গেল।

তখন আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে, আল্লাহ তা’আলা যাহের বাতেন এর যে শক্তি আমাকে দান করেছেন, তাকে ব্যয় করার সহিহ জায়গা হল, তাঁকে ওই কাজে ব্যয় করা যে কাজে স্বয়ং রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তার শক্তি-সামর্থ্য ব্যয় করেছেন। আর তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বান্দাদেরকে বিশেষভাবে গাফেল এবং বে-তলব লোকদেরকে আল্লাহ তা’আলার দিকে নিয়ে আসা এবং আল্লাহ তাআলার বাণীকে সমুন্নত করার জন্য জানকে মূল্যহীন করে দেওয়ার প্রচলন ঘটানো।

ব্যাস, ইহাই আমাদের আন্দোলনের মূল কথা। এবং এ কথাই আমরা সকলকে বলে থাকি। এই কাজ যদি জারি থাকে তাহলে বর্তমানের চেয়ে হাজার গুণ বেশি খানকা এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। বরং তখন প্রত্যেক মুসলমান এই এক একটি মাদ্রাসা এবং খানকা বনে যাবে। তখন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আনীত নেয়ামতসমূহ, তার শান মোতাবেক আম ভাবে বন্টন হতে থাকবে।” (মালফুজাতে হজরতজী রহ)

মেওয়াতের মুসলমান ঐ সময় মাথায় টিকি রাখতো, নামায জানতো না, কালেমাও ভালো করে বলতে পারতো না। মুসলমান হয়েও ঘরের মধ্যে তাকের উপর ছোট মূর্তি রাখতো। ঘর হতে বের হওয়ার সময় মূর্তিকে প্রণাম করতো ।

নিযামুদ্দিন মারকাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো, উম্মতকে আবার সাহাবীওয়ালা জিন্দেগীর উপর উঠানো। রাস্তার নর্দমার পাশে পলিথিন আর লাকড়ী দিয়ে তৈরী ঝুপড়ি থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ পর্যন্ত — গোটা মুসলিম উম্মাতকে “দ্বীনের দাঈ” উম্মতে পরিণত করা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে দ্বীনের যে চেহারার উপর ছেড়ে গিয়েছিলেন, দ্বীনের সেই চেহারার উপর উম্মতকে পুণঃবার দাড় করানো। প্রতিটি মুসলমান যেন গোটা উম্মতের ফিকির করনেওয়ালা হয়ে যায়, সাহাবীদের মতই আল্লাহ্‌র রাস্তায় বের হয়ে জান মালের কুরবানী করাকে জিন্দেগীর মাকসাদ বানিয়ে নেয়। উম্মত যদি সাহাবীওয়ালা জীন্দেগী এখতিয়ার করা শুরু করে, সারা দুনিয়ার মানুষকে জান্নাতের পথে রাহবারী করার উদ্দেশ্যে আপন বাড়ী ঘরের মহব্বতকে পিছনে ফেলে আল্লাহ্‌র রাস্তায় খুরুজ করাকে জীবনের আসল কাজ বানিয়ে নেয় তবে তার নিজের দিল থেকে দুনিয়ার মুহাব্বাত বের হয়ে যাবে। আল্লাহ্‌র সাথে তার ঘনিষ্ঠ তাঅাল্লুক তৈরী হবে এবং তার নিজের জীবনে দ্বীন ইসলাম এসে যাবে পরিপূর্ণ চেহারা নিয়ে।

এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই দিল্লির নিযামুদ্দিন এলাকার বাংলাওয়ালী মসজিদে মারকাযী কার্যক্রম শুরু হয়। নিযামুদ্দিন মারকাযের উদ্দেশ্য হলো, উম্মতের জীবনকে সাহাবীওয়ালা ছাঁচে ঢেলে সাজানো। আমরা সাহাবীওয়ালা কৃষক চাই। সাহাবীওয়ালা শ্রমিক চাই। সাহাবীওয়ালা আলেম চাই। সাহাবীওয়ালা ব্যবসায়ী চাই…..। আমরা চাই সাহাবীওয়ালা সমাজ গড়ে উঠুক। কারণ, জামাত হিসাবে একমাত্র সাহাবীদের জামাতের প্রতিই সাধারণভাবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির ঘোষনা আছে।

আজ সেই ছাহাবীওয়ালা ছিফাতের জামাতকে তছনছ করার জন্য কিছু দুষ্কৃতিকারী, তাবলীগ বিদ্বেষী আর কিছু ওলামায়ে ছূ একজোট হয়েছে। এদের ব্যপারে সজাগ থাকতে হবে। নিজামুদ্দীন মারকাযের অধীনেই এ কাজকে হযরতজী ইলিয়াছ রহঃ এর মাকসাদে পৌঁছাইতে হবে।