দেওবন্দ ও আহলে দেওবন্দের পথই আমাদের পথ | মাওলানা সাদ

মাসআলার ইলম হাসিল করতে হবে উলামায়ে কেরামদের থেকে। আলেমদের সাক্ষাতকে সবসময় ইবাদত মনে করবে এবং তাদের মজলিসকে সর্বাগ্রে নিজের জন্য জরুরি মনে করবে। আমাদের এ মেহনতের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে ইলম এবং আলেমদের দিকে ধাবিত করা। নিজের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ভর্তি করে দিবে যে, সঠিক ইলমই এখানে। দুনিয়াবী অন্যসব বিষয়াদিকে সঠিক জ্ঞান মনে না করে এ বিশ্বাস রাখো যে আল্লাহকে চেনার এ ইলমই হলো মূল এবং সফলতার ভিত্তি।

দুনিয়ার অন্যসব ইলম থেকে এ ইলমকে মর্যাদা দেয়াই বড় মুজাহাদা। ইলম তাই যা আল্লাহকে চেনায় মুহাম্মদ সা.-এর তরীকার উপর। আর এ ইলম উলামায়ে কেরামে সান্নিধ্যে তাদের মজলিস থেকেই অর্জন হতে পারে। সুতরাং শুধু কিতাব দেখেই আমল করে নেয়া সাহাবাদের তরীকা নয়, বরং তারা রাসূল সা. এর সান্নিধ্যে থেকেই আমল করেছেন।

নিজে ইলম অর্জন করো আলেমদের মজিলস থেকে, আর তরবিয়ত হাসিল করো আহলুল্লাহদের সোহবতে থেকে। আহলুল্লাহদের সোহবত আর উলামাদের মজলিস। এ দুটো জিনিস হলো মূল। এর মাধ্যমে ইলম আসবে তরবিয়তের সাথে। অন্যথায় কিছু জ্ঞানমাত্র অর্জন করতে পারবে যা আমলের জন্য যথেষ্ট নয়। উলামায়ে কেরাম মজলিস থেকেই ইলম অর্জন করো। আর আলেমদের সাহচর্যকে ইবাদত বিশ্বাস করো।
এখন সবচেয়ে বড়ো ফিতনা ও সবথেকে বড়ো মাহরুমির বিষয় হলো এই যে, ইলমের মজলিসকে খুব হালকা মনে করা হয় এবং ইলমের গুরুত্বকে খুবই সাধারণ মনে করা হয়। এটিই সবচেয়ে বড়ো ফিতনা এবং বিশাল ক্ষতিগ্রস্ততারও কারণ।

দেওবন্দ ও আহলে দেওবন্দের পথই আমাদের পথ | মাওলানা সাদ
মেরে দোস্ত ও বুযুর্গ, আলেমদের মজলিস এবং মসজিদে কোরআনের তাফসীরের হালকাসমূহ আল্লাহর অনেক বড়ো নেয়ামত। যার প্রত্যেকটিই উম্মতের বড়ো প্রয়োজন।
আমি বিশেষভাবে বলছি, সাথীদের ওপর আবশ্যক হলো এই মজলিস ও হালকাসমূহে তারা খুব গুরুত্বের সঙ্গে জুড়বে। হ্যাঁ! তবে এ বিষয়টি অবশ্যই খেয়াল রাখবে যে ব্যক্তি হক্কানী আলেম কি না! আর স্মরণ রাখবে আমরা আলাদা কোনও দল নই, আমাদের মাযহাব ও তরীকা ভিন্ন কিছু নয় বরং আমরা সবাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী। আর আমাদের সবার পথপ্রদর্শক, চলার যে পন্থা ও তরীকা এবং ইলম অন্বেষণে অর্থাৎ দ্বীনি ও দুনিয়াবী যে কোনো পথেই আমাদের সঠিক পদ্ধতি ও রাস্তা খোঁজার মারকায হলো দীনি মাদ্রাসাসমূহ।

আল্লাহ তায়ালা তার রহমতে বিশেষ করে এ ইউপি এলাকায় তার অসীম অনুগ্রহে দ্বীনকে মারকাযি তথা প্রাতিষ্ঠানিকরূপে দান করেছেন। নিজেদের মাসআলাসমূহে এদের দিকে রুজু করা এবং দেওবন্দ ও আহলে দেওবন্দের পথই আমাদের পথ। দ্বীন ও দুনিয়াবি কোনও বিষয়ে নিজেদের মতকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। দেওবন্দ ও আহলে দেওবন্দের ব্যাপারে সামান্য কোনও সন্দেহের চিন্তা করা যায় না। আর দ্বীনের জন্যে মেহনত করতে হবে। এতে কোনও সন্দেহ নেই যে মেহনত মূলত রাসূল সা. ও তার সাহাবীদেরই তরীকা। আল্লাহর কসম! এতে কোনও সন্দেহ নেই।

যেসব মাসআলাসমূহে দেওবন্দের ফায়সালা আছে সেখানে তাবলীগের মেহনতকারীদের কোনও মাসআলাকে নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করা চূড়ান্ত পর্যায়ের গোমরাহী। আর আমি বলবো এটি বড়ো কোনও ফেতনার সবব। এই কথা নিজের অন্তরে সবসময়ের জন্য রেখে দাও। এই মাদ্রাসা ও মারকায ভিন্ন করে কখনোই দেখবে না। আমরা কোনও আলাদা মত পোষণ করি না বা ভিন্ন কোনও তরীকা রাখি না, অথবা ইত্তেহাদ হয়ে আমাদের কোনও মারজা তথা প্রত্যাবর্তনস্থল হবে। এসবের কোনও গুনজায়েশ নেই। এ কারণে যে আপনাদের থেকে নয় বরং হযরত মাওলানা ইলিয়াস সাহেব রহ. এবং এর পূর্ব থেকেই সবসময় ব্যক্তিগত ও সামগ্রিকভাবেই সমস্ত বিষয়েই কিবলা ও মারজা এ প্রতিষ্ঠানই ছিলো। আমি একথা বিশেষভাবে বলছি। কেননা শয়তানের কাজই হলো সে হকপন্থীদের মধ্যে ভ্রান্তি ও খারাপ ধারণা সৃষ্টি করবে। যাতে করে যে কোনওভাবেই মুসলমানদের অন্তরে ইলম ও উলামাদের প্রতি বিরূপ ধারণা জন্ম নেয় এবং ইলম ও আলেমদের থেকে সম্মান দূর হয়ে যায়।

তাবলীগ জামাতের কাজ করা এই উম্মতেরই কাজ। কারা করবে? নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি শুধু তাবলীগের কাজ করবে এটা আমাদের ভুল ধারণা। এই উম্মতের সবাই হযরত মুহাম্মদ সা. এর উম্মত। সবার দায়িত্ব তাগলীগের কাজ করা। কে করবে? কীভাবে করবে? সেটা অন্য বিষয়। কিন্তু সবার উচিত আল্লাহর দ্বীন প্রচারের জন্যে তাবলীগের কাজ করা। সবাই নিজ নিজ পদ্ধতিতে তাবলীগের কাজ করবে। উলামায়ে কেরামগণ তাদের তরিকায় তাবলীগের কাজ করবে, মুফাস্সিরীনে কেরাম তাদের তরিকায় তাবলীগের কাজ করবে। যারা দ্বীনের কাজ করতে চাও তাদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে, উম্মতকে দ্বীনি মারকাজগুলোর সাথে সম্পৃক্ত রাখা এবং জনসাধারণ ও উম্মতের মধ্যকার দূরত্ব দূর করা।

আমি যে সব কথা বললাম তা ভালো করে মনে রাখবে, আর আল্লাহ তাআলা তাওফিক দিলে তা অন্যদের কাছে বয়ান করবে, পৌঁছে দিবে।

হালকা ও দরসের সম্পর্ক মাসলাকে দেওবন্দের সাথে সম্পৃক্ত আছে কিনা? তুমি এটা বলতে পারবে না, এই মসজিদে তাফসিরের দরস হচ্ছে এটা আমাদের কাজ নয়, দ্বীনের কাজ নয়। তাফসিরের দরস যদি তোমাদের কাজ না হয়, দ্বীনের কাজ না হয়, তাহলে তুমি কীভাবে কুরআন শরীফের সাথে সম্পৃক্ততা রাখবে?
অনেক মসজিদ ও মাদ্রাসায় দ্বীনের কাজ হচ্ছে, কোথাও তাফসিরের দরস হচ্ছে, কোথাও হাদীস শরীফের দরস হচ্ছে, কোথাও তাবলীগের কাজ হচ্ছে, কোথাও কোথাও আরো ভিন্ন দ্বীনি বিষয়ের দরস হচ্ছে। এইগুলো একটার সাথে আরেকটা পার্থক্য করা, দ্বীনের কাজ নয় বলা, বড়ই আশ্চর্য ও মূর্খতার বিষয়। এমনটা কখনোই উচিত নয়। হ্যাঁ, তুমি এইটুকু দেখবে এই হালকা ও দরসের সম্পর্ক মাসলাকে দেওবন্দের সাথে সম্পৃক্ত আছে কিনা? তুমি এটা বলতে পারবে না, এই মসজিদে তাফসিরের দরস হচ্ছে এটা আমাদের কাজ নয়, দ্বীনের কাজ নয়। তাফসিরের দরস যদি তোমাদের কাজ না হয়, দ্বীনের কাজ না হয়, তাহলে তুমি কীভাবে কুরআন শরীফের সাথে সম্পৃক্ততা রাখবে?

সমস্যা হচ্ছে, আমাদের মাঝে এখন গ্রুপিং এসে গেছে, এটা আমাদের হলকা, ওইটা তোমাদের হালকা। এটা ইলমওয়ালাদের হালকা, ওইটা তাবলীগওয়ালাদের হালকা। এই বিষয়টা শয়তানের অনেক বড় ফিতনা ও ওয়াসওসা। উম্মত নিজ নিজ হালকায় হালকায় ভাগ হয়ে যাচ্ছে। যদি কোন মসজিদে দাওয়াতের কাজ ও ইলমের দরস এক সাথে হয়, তাহলে নিজেদের মধ্যে ইখতেলাফ করবে না। এভাবে বলা উচিত, আপনারা বিকালে ইলমের দরস করলে আমরা সকালে দাওয়াতের কাজ করবো। সকালে ইলমের দরস হলে বিকালে দাওয়াতের কাজ করবো।

মেরে দোস্ত ও বুযুর্গ, আপনি নিজে শয়তানের এই ফিতনা থেকে বের হন এবং অন্যজনকে বের করার চেষ্টা করেন। কেননা এই হালকাগুলো একটা আরেকটার সাথে কখনোই তাআরুজ নয়। কারণ, দাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে উম্মতকে জাহালত থেকে বের করা, ইলমের সাথে জড়িয়ে রাখা।

সুতরাং যারা দ্বীনের কাজ করবে, তারা কেন নিজেদের মধ্যে ইখতেলাফ করবে? অনেক অনেক উলামায়ে কেরাম আছেন, যারা বড় বড় মাদ্রাসা থেকে ফারেগ হয়ে ছোট ছোট মসজিদে, ছোট ছোট হালকায় দ্বীনের কাজ করছেন। অনেক সাল লাগিয়ে ছোট ছোট মসজিদ, হালকায় লেগে থাকেন এবং জনসাধারণের মাঝে দাওয়াত ও ইলমের গাস্ত করেন।

আপনিও গাস্ত করেন, দাওয়াত ও তালীমে যুক্ত হন, তিন দিনের জন্যে হলেও আল্লাহর রাস্তায় বের হন। মানুষের মাঝে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেন, মানুষকে ইলমের সাথে জুড়িয়ে রাখেন। যদি আল্লাহ তাআলা তাওফিক দেয়, তাহলে নিজেদের মসজিদগুলোকে মাদ্রাসা বানিয়ে নাও। যতদিন পর্যন্ত মসজিদে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা না হবে, ততদিন পর্যন্ত উম্মতকে ইলমের সাথে জড়ানোর ব্যাপক রাস্তা বের হবে না। মসজিদে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলে উম্মতের জন্যে ইলম অর্জন করা সহজ হবে। কারণ সবাই নিজ নিজ মহল্লার মসজিদে এসে ইলম হাসিল করতে পারবে। উম্মত উলামায়ে কেরাম ও সাল লাগানেওয়ালা আলেমদের থেকে কুরআন পড়া শিখবে, ফরজ বিষয়গুলো, নামাজ ও ওজু করার নিয়ম-কানুন শিখবে। মসজিদগুলোতে যেন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়। আর এর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।

সম্প্রতি ভারতরে উত্তরপ্রদেশের একটি জোড়ে মাওলানা সাদ কান্ধলবীর বয়ানের বাংলা অনুবাদ